
সোমদত্তা রায়
“শুধু তোমাকেই ভালোবেসে শুকনো নদীতে ডিঙি ভাসিয়েছি মোহনার কাছে এসে।”
জীবনের কোনো এক নির্জন দুপুরে যখন মনে হয় সব হিসেব চুকে গেছে, ঠিক তখনই প্রেম আসে অতর্কিতে। আসলে প্রেমের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই, কোনো ধরাবাঁধা ছকে একে ফেলা যায় না। কবিগুরুর সেই অমোঘ বাণী মনে পড়ে— “আমার পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো।” জীবনের কঠিন বাঁকে যখন কাছের মানুষটি হঠাৎ হারিয়ে যায়, তখন অনেকেই পণ করেন আর কাউকে সেই শূন্যস্থানে বসাবেন না। বিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরে, মন হয়ে যায় পাথর। কিন্তু বিচিত্র এই মানব হৃদয়; যখন কেউ ভাবে সব শেষ, ঠিক তখনই হয়তো অলক্ষ্যে কেউ দরজায় কড়া নাড়ে।
আমরা মনে করি প্রতিদিন ‘আই লাভ ইউ’ বলাটাই বুঝি ভালোবাসা। আসলে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে অভ্যেসে, যত্নে আর আগলে রাখায়। নচিকেতার গানের মতো— “একশবার নয়, একবার বলো তুমি যে আমার।” যে মানুষটিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না বলে ভাবি, সে যদি হঠাৎ দশ দিন চুপ হয়ে যায়, তখন নিজের চারপাশটা ফাঁকা লাগতে শুরু করে। এই যে হাহাকার, এই যে কারোর অনুপস্থিতি অনুভব করা—এটাই তো ভালোবাসা। এখানে কোনো গাণিতিক হিসেব কাজ করে না। জীবন আর মৃত্যুর মতোই প্রেম এক অনিবার্য সত্য।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ জীবনে কতবার প্রেমে পড়ে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্প্রতি প্রায় ১০ হাজার অবিবাহিত নারী ও পুরুষের ওপর একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল। সেই গবেষণার ফলাফল বেশ চমকপ্রদ। দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জীবনে অন্তত দুবার প্রেমে পড়েছেন। ১১ শতাংশ মানুষ তিন বা চারবার হৃদয়ের লেনদেন করেছেন। তবে সবথেকে অবাক করা তথ্য হলো, ১৪ শতাংশ মানুষ দাবি করেছেন তারা কোনোদিন প্রেমে পড়েননি। যেমনটা গানে বলা হয়— “সবাই তো সুখী হতে চায়, তবুও কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না।”
প্রেমের সংখ্যা নিয়ে মানুষের মতভেদের শেষ নেই। একদল মনে করেন, সত্যিকারের প্রেম জীবনে একবারই আসে। বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও সেই প্রথম অনুভূতির রেশ মনের গহীনে থেকে যায়। পরবর্তী জীবনে অন্য কেউ এলেও সেই বিশেষ জায়গাটি দখল করতে পারে না। তাদের জন্য বোধহয় সেই লাইনটিই প্রযোজ্য— “প্রথম প্রেমই শ্রেষ্ঠ প্রেম, ভোলা কি যায় তারে?” তবে এর মানে এই নয় যে তারা বর্তমান সঙ্গীকে ভালোবাসেন না, বরং প্রথম প্রেমের স্মৃতি তাদের কাছে এক অমলিন সম্পদ।
আবার অন্য একটি দলের মতে, দ্বিতীয় প্রেমই হলো প্রকৃত প্রেম। কারণ, প্রথম প্রেমের ভুলভ্রান্তি এবং অপরিপক্বতা কাটিয়ে মানুষ যখন দ্বিতীয়বার কারো হাত ধরে, তখন সেই সম্পর্কে গভীরতা ও স্থায়িত্ব বেশি থাকে। অনেকে আবার তৃতীয় প্রেমকে জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে মনে করেন। মজার ব্যাপার হলো, জ্যোতিষ শাস্ত্রও এ বিষয়ে নীরব নয়। বিভিন্ন রাশির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মানুষের জীবনে প্রেমে পড়ার সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, প্রেম একবার হোক বা একাধিকবার—তার আবেদন চিরন্তন। কেউ হয়তো প্রথম ধাক্কাতেই নিজের গন্তব্য খুঁজে পায়, কেউ আবার বারবার পথ হারায় সঠিক মানুষের খোঁজে। সংখ্যা দিয়ে আবেগের গভীরতা মাপা যায় না। জীবন আমাদের যখন যে মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করায়, তাকে কতটা যত্ন আর সম্মানের সাথে আগলে রাখতে পারছি, সেটাই প্রেমের সার্থকতা। প্রেম মানে কেবল আবেগ নয়, প্রেম মানে হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও একে অপরের অভ্যেস হয়ে বেঁচে থাকা। ঠিক যেন সেই গানের সুরের মতো “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।”
