
কলকাতার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে কালীঘাট মন্দির এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাথা নত করে এসেছে বিশ্বাস নিয়ে, নিঃশব্দ প্রার্থনা নিয়ে। এখানে দেবীর সামনে দাঁড়ানো মানে সাধারণত নিজের অহংকার ঝেড়ে ফেলা, অন্তরের ভক্তিকে প্রকাশ করা। কিন্তু রাজনীতির ক্যামেরা যখন মন্দিরের দরজায় ঢুকে পড়ে, তখন সেই পবিত্রতার পরিবেশ অনেক সময়ই অন্য এক ছবিতে বদলে যায়।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা সম্প্রতি কালীঘাট মন্দিরে পূজো দিতে এসে যেন সেই প্রশ্নটাই আরও স্পষ্ট করে দিলেন। দেবীর সামনে দাঁড়ানোর সেই মুহূর্তে ভক্তির নীরবতা যতটা চোখে পড়ার কথা, তার চেয়ে বেশি চোখে পড়ল ক্যামেরার ঝলকানি আর ছবি তোলার ব্যস্ততা। যেন পূজো নয়, একটা রাজনৈতিক ‘ফটো-অপ’ চলছে। দেবীর সামনে প্রণামের দৃশ্যও যেন ক্যামেরার জন্য সাজানো একেকটা ফ্রেম।
এই দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই মনে করিয়ে দেয় দেশের রাজনীতিতে বহুদিন ধরে চলা এক প্রবণতার কথা। যে দল ধর্ম আর ভগবানের নাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ, সেই দলই বারবার ধর্মীয় স্থানকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করছে। ভক্তির জায়গা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে প্রচারের মঞ্চে। দেবতার সামনে দাঁড়ানোও যেন হয়ে উঠছে রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর কৌশল।
ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানোর এই প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু আজ তা এতটাই প্রকাশ্য যে অনেক সময় মনে হয়, বিশ্বাসের গভীরতা নয়, বরং তার প্রদর্শনটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মন্দিরে যাওয়া, পূজো দেওয়া, প্রণাম করা, সবকিছুই তখন ক্যামেরার সামনে ঘটতে হবে। যেন ধর্মের সত্যতা প্রমাণ করতে হলে তা জনসমক্ষে দেখাতেই হবে।
এই ছবিগুলো দেখে অনেকেরই প্রশ্ন উঠছে, যে রাজনীতি সারাক্ষণ ধর্মের নামে আবেগ উসকে দেয়, সেই রাজনীতির ভেতরে কি আদৌ ভক্তির কোনও জায়গা আছে? নাকি ধর্ম সেখানে কেবলমাত্র এক কার্যকর রাজনৈতিক প্রপস? কারণ বিশ্বাস সাধারণত নীরব হয়, আত্মিক হয়। তাকে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন পড়ে না।
কালীঘাটের মতো প্রাচীন তীর্থক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ আসে দেবীর আশীর্বাদ চাইতে। সেখানে রাজনীতির এই প্রদর্শনী অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর মনে হওয়া স্বাভাবিক। দেবীর সামনে মাথা নত করার মুহূর্ত যদি বারবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সাজাতে হয়, তাহলে সেই ভক্তি আর বিশ্বাসের মধ্যে কতটা সত্যতা থাকে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধর্ম যেন ক্রমশ এক শক্তিশালী ‘ইমেজ ম্যানেজমেন্ট’-এর অংশ হয়ে উঠছে। যে দল ধর্মের নামে সবচেয়ে বেশি আওয়াজ তোলে, তাদের ক্ষেত্রেই বারবার দেখা যায় ধর্মকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে দৃশ্যমানতার জন্য। মন্দির তখন আর শুধু মন্দির থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রচারের মঞ্চ।
কালীঘাটের সেই মুহূর্ত তাই শুধু একটি সফরের ছবি নয়। এটি যেন এক বড় বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে ধর্মের গভীরতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক প্রদর্শনের ভিড়ে। আর সেই ভিড়ের মাঝেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রশ্নটি, বিশ্বাস কি সত্যিই আছে, নাকি তা এখন কেবল দেখানোর রাজনীতির আরেকটি মুখোশ।
