
নিভে গেল রাজনীতির নেপথ্যের চাণক্য
বাংলার রাজনীতির দাবার ছকে আজ হঠাৎ থেমে গেল এক নীরব চালকের হাত। বহুদিন ধরে অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখা অসংখ্য সমীকরণ যেন মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। যিনি সামনে না থেকেও পেছন থেকে রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারতেন, সেই মানুষটি আর নেই। তিনি মুকুল রায়। তাঁর চলে যাওয়া যেন বাংলার রাজনৈতিক কাহিনির এক রহস্যময় অধ্যায়ের অবসান।
রাজনীতির ময়দানে অনেকেই আছেন যারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে ভাষণ দেন, জনতার উচ্ছ্বাসে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেন। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন সম্পূর্ণ অন্যরকম। তারা আলোয় নয়, ছায়ায় কাজ করেন। তারা শব্দের ঝড় তোলেন না, বরং নিঃশব্দে সাজিয়ে তোলেন ভবিষ্যতের পথ। মুকুল রায় ছিলেন সেই বিরল স্বভাবের মানুষদের একজন। তাঁর উপস্থিতি যেন ছিল অদৃশ্য অথচ গভীর, যেন নদীর তলদেশের স্রোত, বাইরে থেকে যার গতি বোঝা যায় না, অথচ সেই স্রোতই বদলে দেয় নদীর দিক।
তৃণমূল কংগ্রেস যখন বাংলার মাটিতে নিজের শিকড় ছড়াতে শুরু করেছিল, তখন সেই শিকড়কে শক্ত করে ধরিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। সংগঠনের অন্দরমহলে কর্মী থেকে নেতৃত্ব, সব স্তরে তিনি বুনেছিলেন এক বিস্তৃত বন্ধন। রাজনীতির জটিল অঙ্ক তিনি এমনভাবে কষতেন, যেন বহু আগেই বুঝে ফেলেছেন আগামী দিনের চাল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথে তিনি ছিলেন ছায়াসঙ্গীর মতোই নিবিড়। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাস্তায় যেমন স্লোগানের ঢেউ উঠেছিল, তেমনি নীরবে সংগঠনের ভিত মজবুত করার কাজ চলেছিল তাঁর হাত ধরে। পরিবর্তনের স্বপ্ন যখন বাংলার রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছিল, তখন সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করানোর নেপথ্য চিন্তাশক্তির অন্যতম কেন্দ্র ছিলেন মুকুল রায়।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন অবশ্য কখনও এক সরল রেখায় চলেনি। সময়ের বাঁকে বাঁকে তিনি নতুন পথও বেছে নিয়েছেন। একসময় তিনি পা বাড়িয়েছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টি-র দিকেও। সেই সিদ্ধান্তে রাজনীতির অন্দরে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। আবার একদিন তিনি ফিরে এসেছিলেন পুরনো রাজনৈতিক ঠিকানায়। এই আসা-যাওয়ার পথ যেন তাঁর জীবনের নাটকীয়তাকেই আরও গভীর করে তুলেছিল।
জীবনের শেষ পর্বে শরীর ধীরে ধীরে তাঁকে সরিয়ে দেয় রাজনৈতিক কোলাহলের কেন্দ্র থেকে। যে মানুষটি একসময় অসংখ্য কৌশলের নেপথ্য নির্মাতা ছিলেন, তিনি ক্রমে চলে যান নিভৃত অন্ধকারে। তবুও তাঁর নাম রাজনীতির অলিন্দ থেকে মুছে যায়নি, কারণ তাঁর বোনা সমীকরণ বহুদিন ধরে রাজনীতির ভেতরে ভেতরে বেঁচে থেকেছে।
আজ তিনি নেই। তবুও বাংলার রাজনৈতিক স্মৃতিতে থেকে যাবে এক নীরব কৌশলীর গল্প, যিনি সামনে না থেকেও বহু পথের দিশা দেখিয়েছিলেন। তাঁর চলে যাওয়া কেবল একজন নেতার প্রস্থান নয়, বরং এক সময়ের, এক কৌশলের, এক অদৃশ্য শক্তির বিদায়। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে তাই মুকুল রায় নামটি থেকে যাবে নেপথ্যের সেই স্থপতি হিসেবে, যিনি নিঃশব্দেই বদলে দিয়েছিলেন বহু ঘটনার গতিপথ।
