
দিব্যেন্দু ঘোষ
আটই মার্চ ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধু একটা লাল দাগ নয়, কয়েক হাজার বছরের জমানো আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। এ এক এমন দিন, যেদিন ড্রয়িংরুমের ‘সুশীলা’ তকমাটা ছিঁড়ে ফেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে হয়— “লজ্জা কি কেবল নারীর অন্তর্বাস? নাকি পুরুষের বিকৃত লালসা ঢাকার এক সস্তা ওজর?” যুগ যুগ ধরে নারীকে পুরুষতন্ত্রের বস্তায় মুড়ে রাখা হয়েছে। শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া আর বোরখার নীচে তার সত্তাকে চাপা দিয়ে ভাবা হয়েছে সে নিরাপদ। অথচ সত্য এই যে, কাপড়ের স্তর যত বেড়েছে, পুরুষের চোখের ‘কামনা-খনি’ তত গভীর হয়েছে। লজ্জা যদি পরতেই হয়, তবে পরুক সেই মানসিকতা যা এক দুধের শিশুকে ‘যোনিগর্ত’ হিসেবে দেখে। নারী কোনও লজ্জার প্যাকেট নয়, সে এক প্রবহমান দহন।
চিত্রাঙ্গদার গর্জন আর বনলতার নীরবতা
রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা যখন মদনের কাছে রূপের ভিক্ষা চেয়েছিল, সে ছিল এক সাময়িক মোহ। কিন্তু যখন সে ঘোষণা করল— “দেবী নহি, নহি আমি সামান্যা রমণী”, সেটিই ছিল আসল অনুধাবন, দ্রোহ। নারী আজ আর অর্জুনের শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার জন্য কোনও ‘সুরূপার’ ছদ্মবেশ চায় না; সে চায় সংকটের পথে সমান ভাগীদার হতে। অন্যদিকে, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন সেই কবেকার বিদিশার নিশার মতো চুল মেলে আমাদের ক্লান্তিতে শান্তি দিয়েছিল। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবেছি, সেই বনলতার চোখের নীড়েও কোনও ব্যক্তিগত ঝড় ছিল কি না? নারী শুধু ‘অন্ধকারে মুখোমুখি বসিবার’ পুতুল নয়; সে তার নাভি থেকে নিঃসৃত প্রাণরসে সভ্যতাকে হুইস্কির মতো কড়া নেশায় বুঁদ করে দিতে পারে।
নগ্ন সত্যের মুখোমুখি
নজরুলের সেই অমোঘ সাম্যবাদী সুর আজ বড় বেশি দরকার। বিশ্বে যা কিছু মহান, তার অর্ধেক নারীর সৃষ্টি। তবুও সমাজ কেন তাকে শুধু ‘মমতাময়ী’র ফ্রেমে আটকে রাখতে চায়? নজরুলের কলম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অসতী মাতার পুত্র যদি জারজ হয়, তবে সেই বীর্যদাতা পুরুষটি কেন কলঙ্কমুক্ত? এই দ্বিচারিতার নামই কি সংস্কৃতি?
আজ একটু মরমী হই। কৃত্রিম গঙ্গাজল নয়, জীবনের সমস্ত তৃষ্ণা আর দহন মেটাতে দরকার সাহসের এক ফোঁটা ‘হুইস্কি’। নারীর নাভি যদি হয় সৃষ্টির সেরা আধার, তবে সেই সুধা অপবিত্র বস্তু তো নয়; তা হল জীবনেরই এক উদ্দাম উদ্যাপন। শরীর কোনও পাপ নয়, শরীর হল সেই মন্দির যেখানে প্রাণের স্পন্দন বেজে ওঠে।
কেন এই বিভাজন?
লজ্জা যদি ভূষণ হয়, তবে তা হোক সেই চোখের, যে চোখ নারীকে ‘মাংসের দলা’ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে শেখেনি। নারীর কণ্ঠকে চুপ করানোই যদি ‘ভদ্রতা’ হয়, তবে সেই সভ্যতার গায়ে থুতু ফেলা উচিত। নারী ‘অর্ধেক আকাশ’ নয়, সে তার নিজের অধিকারে এক অখণ্ড মহাবিশ্ব। নারী কোনও লিঙ্গভিত্তিক লজ্জা নয়, সে এক পূর্ণাঙ্গ, অবাধ্য এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক মানুষ।
শতাব্দী ধরে তার হাঁটা, চলা, হাসা আর শোয়াতে ‘অস্বাভাবিক’ ট্যাগ ঝুলিয়ে দিয়েছে যারা, তাদের পুরুষাঙ্গ-কেন্দ্রিক মানসিকতা এবার ভাঙার সময় এসেছে। পুরুষের বীর্য-মানসিকতা থেকে যোনির স্বাদ মোছেনি বলেই আজ নারীকে আবরণে ঢাকতে হয়, এই বিকৃতি রুখতে হবে শরীর ঢেকে নয়, চোখ আর মনকে সংযম শিখিয়ে।
নতুন সকালের ইশতেহার
আজকের এই দিনটি কোনও উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা নয়। কোনও শুকনো ফুলের তোড়া বা সোশাল মিডিয়ার সস্তা স্ট্যাটাসে নারীত্বকে বন্দি করবেন না। বরং ছিঁড়ে ফেলুন সেই অদৃশ্য শৃঙ্খল যা নারীকে ‘চিরস্থায়ী আবরণে মোড়া বস্তু’ বানিয়ে রেখেছে। নারী আজ জেগেছে তার নিজস্ব আদিম আর আধুনিক সৌন্দর্যে। সে আর ‘মাদকতাময় মিসরীয় কলসি’ নয়, সে নিজেই এক অনন্ত তৃষ্ণা। লজ্জা যদি পরতে হয়, তবে তা পরুক সেই সমাজ যারা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। আজকের এই দিনটি হোক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর, যেখানে নারী দেবীও নয়, পণ্যও নয়; সে কেবল এক রক্ত-মাংসের স্বাভাবিক মানুষ। তার শরীর অস্বাভাবিক নয়, তার স্পর্ধাই তার প্রকৃত অলঙ্কার।
মিথ্যে শ্লীলতা
সব বিদ্রোহের শেষে, যখন পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে যায়, যখন স্তব্ধ হয়ে আসে কোলাহল, তখন কোনও এক নির্জন চিলেকোঠায় বা আদিম অরণ্যের ছায়ায় মুখোমুখি দাঁড়ানো সেই পুরুষ আর নারীর কথা ভাবুন। সেখানে লজ্জা নেই, আবরণ নেই, নেই মিথ্যে শ্লীলতা। সেখানে নারী দাঁড়িয়ে আছে তার পূর্ণাঙ্গ নগ্ন সত্য নিয়ে, অর্ধেক কল্পনা নয়, ষোলো আনা রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে। পুরুষ যদি সেদিন তার চোখের সেই বিকৃত ‘কাম-খনি’ উপড়ে ফেলে প্রকৃত ‘মানুষ’ হতে পারে, তবেই শুরু হবে এক নতুন মহাকাব্য। সেদিন নারী তাকে উদ্ধার করবে না, দুজনে মিলে ডুব দেবে আখি ছলছল হুইস্কির সাগরে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে নারী আর ‘বনলতা সেন’ হয়ে শান্তি দেবে না, বরং সে নিজেই হবে অশান্ত সমুদ্র। তার চুলের গন্ধ বিদিশার নিশা নয়, হবে এক আসন্ন বিপ্লবের সুবাস। শেষ রক্তিম সূর্যটা যখন ডুববে, তখন নারী তার প্রেমিকের ঠোঁটে ঢেলে দেবে সেই চূড়ান্ত অমৃতবারি, যা গঙ্গাজল নয়, আগুনের মতো তীব্র এক সত্য। নারী তখন পুরুষের বাহুডোরে ‘সুরূপা’ হয়ে ধরা দেবে না, নিজের সবটুকু ‘কুরূপা’ অহঙ্কার নিয়ে বলবে— ‘আমারে পাশে রাখো সংকটের পথে, দুরূহ চিন্তার অংশ দাও’। সেদিন নারী দিবসের উৎসব শেষ হবে এক মরমী চুম্বনে, যা পৃথিবীর কোনও লিঙ্গ চেনে না, চেনে কেবল দুটি স্বাধীন আত্মার মিলন। পুরুষ সেদিন বুঝবে, নারীকে ঢাকা দেওয়ার নাম সভ্যতা নয়, নারীর অবাধ্যতাকে ভালবেসে নিজের ভেতরের পশুটাকে পুড়িয়ে মারার নামই হল প্রকৃত প্রেম। লেখা হোক নতুন ইতিহাস— যেখানে নারী কোনও ‘বস্তু’ নয়, এক চিরকালীন মুক্ত উল্লাস।
মনোরম মনোলগ
(মঞ্চে কোনও লাল আলো নয়, বিরাজ করছে এক কঠিন ধূসর নিস্তব্ধতা। চরিত্রের নাম হোক উল্কা। সে কোনও পানপাত্র হাতে নয়, মঞ্চের মাঝখানে রাখা একটি জীর্ণ কাঠের চেয়ারে উল্টো করে বসবে, যেন সে কোনও জেরার মুখোমুখি, কিন্তু জেরাটা সে নিজেই করছে সমাজকে। নাটকের নাম ‘অ-শ্লীলতার ইশতেহার’, চরিত্র- উল্কা, এক জ্বলন্ত ধ্রুবতারা। মঞ্চ অন্ধকার। কেবল একটি হ্যালোজেন বাতি ওপর থেকে লম্বভাবে উল্কার ওপর পড়ছে। তার হাতে একটা পুরনো খবরের কাগজ, যা সে কুচি কুচি করে ছিঁড়ছে। কণ্ঠস্বর অত্যন্ত নিচু স্বরে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বিস্ফোরণের দিকে যায়)
উল্কা: (কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে) আপনারা কি গন্ধ পাচ্ছেন? না, পচা মাংসের নয়। আপনাদের ওই বিধিবদ্ধ সভ্যতার সুগন্ধি মেখে রাখা পচাগলা শব্দগুলোর গন্ধ। ‘নারী’, ‘মর্যাদা’, ‘শ্লীলতা’… শব্দগুলো শুনলে আজকাল আমার বমি পায়। আপনারা আমার শরীরের ওপর ইতিহাসের প্রতিটা পাতায় যে লক্ষ্মণরেখা টেনেছেন, সেটা কি আমার নিরাপত্তার জন্য? নাকি আপনাদের আদিম ভয়ের পাঁচিল? আপনারা চেয়েছিলেন আমি একটা ‘বস্তু’ হই। সুন্দর করে প্যাকিং করা, ফিতে দিয়ে বাঁধা, যাতে আপনাদের বীর্যের অহঙ্কার আর লালসার নখ দিয়ে আমাকে আঁচড়াতে সুবিধে হয়। লজ্জা? লজ্জা শব্দটা তো আপনারা আবিষ্কার করেছিলেন নিজেদের বিকৃতিকে জাস্টিফাই করতে। নারীকে বস্ত্রের স্তূপে কবর দিয়ে আপনারা ভেবেছিলেন পুরুষের চোখ সংযত হবে? ভ্রান্তি! আপনাদের কাম তো লেবাসে নয়, আপনাদের ডিএনএ-তে।
(চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, মঞ্চের সামনের দিকে একদম দর্শকদের কাছে চলে আসে)
রবীন্দ্রনাথের সেই ‘অমর প্রতিমা’র ফ্রেমটা আমি আজ লাথি মেরে ভেঙে দিচ্ছি। আমি বনলতা নই যে হাজার বছর ধরে আপনাদের ক্লান্তির সেবা করব। আমি চিত্রাঙ্গদার সেই কুরূপা সত্তা, যার ঘামে আর রক্তে মাটির গন্ধ লেগে আছে। আপনারা আমার নাভি ঢাকতে চেয়েছেন, আমার স্তন ঢাকতে চেয়েছেন, কিন্তু আমার জেদ ঢাকবেন কী দিয়ে? আমার মগজের ভেতরে যে নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ চলছে, তাকে কোন বোরখা বা কোন আঁচলে বাঁধবে এই পুরুষশাসিত আদালত?
(তীব্র স্বরে) সভ্যতার গোড়া থেকেই আপনারা আমার হাসিকে ‘অশালীন’ বলেছেন, আমার চলায় ‘অস্বাভাবিক’ তকমা সেঁটে দিয়েছেন। কারণ আপনারা ভয় পান। ভয় পান সেই নারীকে, যে নিজের শরীরের বাঁকগুলোকে কোনও পাপ নয়, এক একটা মানচিত্র বলে চেনে। আমি চামড়া আর মাংসের যোগফল নই। আমি কোনও চিরস্থায়ী আবরণে মোড়া সিন্দুক নই। আমি এক অবাধ্য মহাবিশ্ব।
(কণ্ঠস্বর হঠাৎ মরমী হয়ে আসে, এক অদ্ভুত মায়াবী টান)
তবে শুনুন, এক অন্তিম সত্য বলি। যখন সমস্ত যুদ্ধের শেষে কোনও এক পরিত্যক্ত বন্দরে আমরা মুখোমুখি হব, সেদিন আর আমাকে ‘অর্ধেক মানবী’ বলে ডাকবেন না। সেদিন আমার ঠোঁটে থাকবে হুইস্কির সেই আদিম তিতকুটে স্বাদ, যা আপনাদের মিথ্যে গঙ্গাজলকে ধুয়ে দেবে। সেদিন যদি আমার হাতে হাত রাখতে চান, তবে আগে নিজের ভেতরকার ওই জানোয়ারটাকে নগ্ন করে দাঁড় করান। সেদিন কোনও ‘নারী দিবস’ থাকবে না। থাকবে শুধু দু’টো মানুষের একে অপরের সত্তাকে চিনে নেওয়ার অধিকার। সেদিন আমি আপনার বাহুডোরে ‘সুরূপা’ হয়ে ধরা দেব না, নিজের সবটুকু ‘অশ্লীল’ জেদ নিয়ে বলব— ‘তাকাও আমার চোখের দিকে, ওখানে লজ্জা নেই, আছে এক অখণ্ড আগুনের উল্লাস’। সেদিন আমাদের আলিঙ্গন লিঙ্গ চিনে আসবে না, চিনে আসবে কেবল দু’টো স্বাধীন আত্মার চূড়ান্ত মুক্তি। সেই ক্লাইম্যাক্সেই শেষ হবে আপনাদের ওই পুরনো শাসনের পাণ্ডুলিপি।
(উল্কা পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে ছেঁড়া কাগজের কুচিগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের শিখা জ্বলে উঠতেই মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যায়।)
