
বঙ্গে দুদফায় ভোট। দামামা বেজে গেল। ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল, ছোট অথচ তীক্ষ্ণ ভোট-সূচি বাংলার রাজনীতির সমীকরণকে এক অদ্ভুত মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ড্রয়িংরুম থেকে পাড়ার চায়ের দোকান, প্রশ্ন একটাই: এই মিনি নির্ঘণ্ট কার জন্য সুবিধাজনক? মমতা কি শেষ মুহূর্তের মাস্টারস্ট্রোকে কিস্তিমাত করলেন, নাকি পরিবর্তনের ঝড়ে পদ্ম ফুটবে নবান্নে?
সাধারণত বাংলায় সাত-আট দফায় ভোট হতে অভ্যস্ত আমরা। সেখানে মাত্র দুই দফায় ভোট হওয়াটা এক অভাবনীয় ঘটনা।
তৃণমূলের সুবিধা
কম দফায় ভোট মানেই প্রচারের সময় কম। আর এখানে এগিয়ে থাকে শাসক দল। কারণ, তৃণমূলের সাংগঠনিক জাল বুথ স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। কম সময়ের লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ‘ক্যারিশমা’ এবং ‘বাঙালি আবেগ’কে বেশি সংহত করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘনঘন আসা-যাওয়ার সুযোগও কমবে।
বিজেপির চ্যালেঞ্জ
বিজেপির মূল রণকৌশল হল হাই-ভোল্টেজ প্রচার। লম্বা দফায় ভোট হলে মোদি-শাহরা দফায় দফায় রাজ্যে এসে হাওয়া গরম করতে পারেন। দুই দফার ভোটে সেই কার্পেট বম্বিং প্রচারের সুযোগ কিছুটা কমবে। তবে, বিজেপি যদি মেরুকরণ এবং দুর্নীতির ইস্যুকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারে, তবে এক ধাক্কায় ভোট সেরে ফেলা তাদের জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাক-ভোট’ মাস্টারস্ট্রোক
ভোট ঘোষণার ঠিক আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা করলেন, তাকে দাবার ভাষায় বলা হয় ‘কুইনস গ্যাম্বিট’। রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘদিনের বকেয়া ডিএ নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন। মার্চ মাসের মধ্যে বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মমতা সেই ক্ষোভে জল ঢালার চেষ্টা করেছেন। সরকারি কর্মচারীরাই ভোটের কাজে যুক্ত থাকেন, তাই তাঁদের মন পাওয়া তৃণমূলের জন্য রণকৌশলগতভাবে খুব জরুরি ছিল। ৫০০ টাকা করে ভাতা বাড়ানোটা স্রেফ অর্থনৈতিক নয়, পুরোপুরি রাজনৈতিক। ইমাম-মোয়াজ্জেমদের ভাতা বাড়িয়ে যেমন সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, তেমনি পুরোহিত ভাতা বাড়িয়ে বিজেপির ‘হিন্দুত্ব’ তাসকে ভোঁতা করার চেষ্টা করেছেন। মমতা দেখাতে চেয়েছেন, তিনি সবার জন্য, তিনি ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর মুখ।
কেন্দ্রীয় বাহিনী কি ফ্যাক্টর হবে?
দুই দফার ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহার নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন আছে। বাহিনীর সংখ্যা যদি পর্যাপ্ত না হয়, তবে ভোট লুঠ বা সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকে। বিজেপি চাইবে প্রতিটি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকুক যাতে ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন। কিন্তু মাত্র দুই দফায় পুরো রাজ্যে বাহিনী মোতায়েন করা নির্বাচন কমিশনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি বাহিনী সক্রিয় হয়, তবে বিজেপির ভোট শতাংশ বাড়বে। আর যদি স্থানীয় পুলিশ বা সিভিক ভলান্টিয়ারদের দাপট থাকে, তবে অ্যাডভান্টেজ তৃণমূল।
কার অ্যাডভান্টেজ? কার লাভ?
মমতার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর উপভোক্তা ভোটব্যাঙ্ক। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী এবং শেষ মুহূর্তে ঘোষণা করা ডিএ-ভাতা— এই ‘টাকা সরাসরি পকেটে’ যাওয়ার স্কিমগুলো তৃণমূলকে এক কদম এগিয়ে রাখছে। এছাড়া ২০২৬-এর লড়াইয়ে মমতা ‘বাঙালি অস্মিতা’ এবং ‘বহিরাগত’ ইস্যুকে আবার শান দিচ্ছেন। বিজেপির বড় অস্ত্র হল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। ১৫ বছরের শাসনে ওঠা দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ, নিয়োগ দুর্নীতি এবং সন্দেশখালি-আরজি করের মতো ইস্যুগুলো মানুষের মনে দগদগে। মধ্যবিত্ত এবং তরুণ প্রজন্ম যদি কর্মসংস্থান আর স্বচ্ছ শাসনের আশায় ইভিএমে বিদ্রোহ করে, তবে মমতার সব সামাজিক প্রকল্প তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
বিজেপি কি পারবে পরিবর্তন আনতে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তিনটে ‘M’-এর ওপর: Management, Message এবং Mass face। ম্যানেজমেন্ট: তারা কি বুথ স্তরে তৃণমূলের ক্যাডার শক্তির মোকাবিলা করতে পারবে? মেসেজ: তারা কি স্রেফ হিন্দুত্ব নয়, বাংলার নিজস্ব উন্নয়নের কোনও বিশ্বাসযোগ্য ব্লু-প্রিন্ট দিতে পারবে? মাস ফেস: মমতার সমতুল কোনও লড়াকু মুখ কি তারা সামনে আনতে পেরেছে?
বিজেপি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পেশাদার। শুভেন্দু অধিকারীর মতো লড়াকু নেতা তৃণমূলের ঘরোয়া রাজনীতি চেনেন। কিন্তু মমতার মতো ‘জনমোহিনী’ নেত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা কেবল সভার ভিড় দিয়ে সম্ভব নয়, তার জন্য দরকার মানুষের মনের ভেতরকার গভীর পরিবর্তন।
শেষ হাসি কার?
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে লড়াইটা ৫৮:৪২। পাল্লা কিছুটা তৃণমূলের দিকে ভারী, কারণ মমতা শেষ মুহূর্তে যেভাবে ডিএ এবং ভাতা বাড়িয়ে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করেছেন, তা নিচুতলার মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু, তলায় তলায় একটা নিঃশব্দ বিপ্লব দানা বাঁধছে। যদি মানুষ মনে করে ‘অনেক হয়েছে, এবার বদল দরকার’, তবে ৫০০ বা ১০০০ টাকার ভাণ্ডার সেই স্রোত আটকাতে পারবে না। ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল— বাঙালি কেবল ভোট দেবে না, বাঙালি তার আগামী দশকের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। আপাতত লড়াই সমানে সমানে। অ্যাডভান্টেজ মমতা, কিন্তু তাড়া করছে বিজেপির পরিবর্তনের ঢেউ। ভাতার রাজনীতি বনাম দুর্নীতির ইস্যু— এই দুই মেরুর লড়াই এখন বাংলার রাজনীতির প্রধান উপজীব্য। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এক অদ্ভুত দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরাসরি আর্থিক সুবিধার ‘নিরাপত্তা’, অন্যদিকে অপশাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ‘ক্ষোভ’। এই সংঘাতের গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মোড় সামনে আসে।
ভাতার রাজনীতি: ‘অভেদ্য’ বর্ম?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব ভালভাবেই জানেন, বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা এখন সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা বর্ধিত ভাতার মতো প্রকল্পগুলো কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এগুলো একটি ‘পলিটিক্যাল লয়্যালটি’ বা রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরি করে। একজন ভোটার যখন দেখেন যে মাসে মাসে তাঁর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে, তখন তিনি বড় কোনও পরিবর্তনের ঝুঁকি নিতে ভয় পান। তাঁর মনে আসতে বাধ্য, বদলালে কি এই টাকাটা পাব? এই ‘অনিশ্চয়তা’র ভীতিই তৃণমূলের সবথেকে বড় অস্ত্র। ডিএ বৃদ্ধি বা মোয়াজ্জেম-পুরোহিত ভাতা বাড়িয়ে মমতা আসলে সেই সব মধ্যবিত্ত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ক্ষোভ প্রশমিত করতে চেয়েছেন, যারা দুর্নীতির কারণে শাসকদলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল। এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’, যা দুর্নীতির ইস্যুকে প্রান্তিক স্তরে ভোঁতা করে দিতে পারে।
দুর্নীতির ইস্যু: নিঃশব্দে জমা হওয়া আগ্নেয়গিরি
বিরোধীদের, বিশেষ করে বিজেপির প্রধান তুরুপের তাস হল শাসকদলের আমলের দুর্নীতি। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে আরজি কর কাণ্ড, ইস্যুগুলোর তালিকা দীর্ঘ। শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে ৫০০ বা ১০০০ টাকার ভাতার চেয়ে ‘চাকরি’ এবং ‘স্বচ্ছতা’ অনেক বেশি জরুরি। আরজি কর পরবর্তী নাগরিক সমাজ যেভাবে রাস্তায় নেমেছে, তা প্রমাণ করে যে ভাতার রাজনীতি দিয়ে এই অংশের মানুষের নৈতিক ক্ষোভ চাপা দেওয়া অসম্ভব। গ্রামেও কি দুর্নীতি প্রভাব ফেলবে না? অবশ্যই ফেলবে। যখন একজন গরিব মানুষ দেখেন যে তাঁর পাড়ার তৃণমূল নেতা দোতলা বাড়ি বানাচ্ছেন কিন্তু তাঁর নিজের ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে আছে, তখন ভাতার তুষ্টির চেয়ে বঞ্চনার জ্বালা বড় হয়ে দেখা দেয়। বিজেপি এই ‘অসন্তোষ’কেই ভোটে রূপান্তর করতে চাইছে।
উন্নয়নের সংজ্ঞা: কার চোখে কেমন?
বাংলার মানুষ কি স্রেফ উন্নয়নের নামে ভোট দেবে? এখানে ‘উন্নয়ন’-এর সংজ্ঞা শাসক ও বিরোধীদের কাছে আলাদা। তৃণমূলের কাছে উন্নয়ন মানে ‘সামাজিক সুরক্ষা’। রাস্তা, জল বা বিজলি নয়, মানুষের হাতে সরাসরি টাকা পৌঁছে দেওয়াকেই তারা উন্নয়নের মডেল হিসেবে খাড়া করেছে। বিজেপির মডেল হল ‘শিল্পায়ন ও পরিকাঠামো’। তারা বলছে, ভাতা দিয়ে মানুষকে পরনির্ভরশীল না করে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। বাংলার গড়পড়তা ভোটার এখন এই দুই দর্শনের মাঝে দাঁড়িয়ে। যারা তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি চান, তারা ভাতার দিকে ঝুঁকবেন। আর যারা দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ এবং সুশাসনের কথা ভাবছেন, তারা উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞার দিকে তাকাবেন।
কার পাল্লা ভারী?
গভীর রাজনৈতিক মোড়কে বিচার করলে দেখা যায়, ভাতার রাজনীতি হল ‘ডিফেন্সিভ’ কৌশল, আর দুর্নীতির ইস্যু হল ‘অফেন্সিভ’ অস্ত্র। যদি ভোট দানা বাঁধে কেবল ‘গরিবের রক্ষক’ ইমেজের ওপর, তবে ভাতার রাজনীতি জিতে যাবে। কারণ, ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে, সরাসরি পকেটে আসা টাকা বড় বড় কেলেঙ্কারিকেও আড়াল করে দিতে পারে। যদি কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে এবং ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ যদি গ্রাম বাংলার অলিগলি পর্যন্ত পৌঁছয়, তবে ভাতার রাজনীতি বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়বে। কারণ, ভাতার পরিমাণ মুদ্রাস্ফীতির বাজারে খুব একটা বেশি নয়।
ব্যালট বক্সের গোপন সত্য
শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অ্যাডভান্টেজ কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ তিনি রাজনীতির ব্যাকরণ জানেন, মানুষের পেটের খিদে মেটানোর চেয়ে বড় কোনও রাজনীতি নেই। কিন্তু বিজেপির কাছে সুযোগ আছে এই ক্ষোভকে ‘সম্মান’ ও ‘ভবিষ্যৎ’-এর লড়াইয়ে পরিণত করার। বাংলার মানুষ এবার স্রেফ উন্নয়নের নামে ভোট দেবে না; তারা ভোট দেবে ‘কার ওপর বেশি ভরসা করা যায়’ তার ওপর। ভাতা কি মানুষের দীর্ঘদিনের নৈতিক আদর্শকে কিনে নিতে পারবে? নাকি দুর্নীতির ক্ষোভ সব হিসেব উল্টে দেবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ২৩ এবং ২৯ এপ্রিলের সেই গোপন ব্যালটে। বিরোধী শিবির কি মানুষের মনে এই ভীতি কাটাতে পেরেছে যে ‘বদল হলে প্রকল্প বন্ধ হবে না’? নাকি প্রচারের এই লড়াইয়ে তৃণমূলই এগিয়ে থাকছে? উত্তর মিলবে ৪ মে।

