
দিব্যেন্দু ঘোষ
মার্চের কাঠফাটা রোদ আর রাজনীতির উত্তাপ, ব্রিগেড মানেই ক্ষমতার আস্ফালন। ভোটব্যাঙ্কের সঙ্গে ব্রিগেড বিশেষ মেলে না, অতীত দেখিয়েছে। লাল আমলে মোটামুটি মিলত। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে মেলে না, কী তৃণমূল কী বিজেপি কী সিপিএম। ব্রিগেড ভরে, ইভিএম ভরে না। মোদির আগুনে ভাষণ আর তৃণমূলকে ফালাফালা করার সময় মনে হচ্ছিল বিগ্রেড যেন আগ্নেয়গিরি। রাজনীতির লাভাস্রোত। জাতগোখরোর হুঙ্কার। কিন্তু শেষ হাসি ঝুলবে কার ঠোঁটে?
নরেন্দ্রর বক্তৃতায় ছিল আক্রমণ, হুঁশিয়ারি আর পরিবর্তনের ডাক। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই হাই-ভোল্টেজ দ্বৈরথে সত্য কতটা আর রাজনীতি কতটা? কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে?
মোদি বনাম মমতা
প্রধানমন্ত্রীর আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনটি বিষয়: নির্মম সরকার, জনসংখ্যার পরিবর্তন এবং মহা জঙ্গলরাজ।
মোদির তূণ থেকে বেরোনো তির
মোদি অভিযোগ করেছেন, বাংলায় সুপরিকল্পিতভাবে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে হিন্দুদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হচ্ছে। ভোটব্যাঙ্কের জন্য রোটি-বেটি-মাটি বিপন্ন। কাটমানি আর সিন্ডিকেট রাজের অভিযোগে তৃণমূলকে ধুয়ে দিয়েছেন তিনি। তৃণমূলের প্রতিটি শোষকের হিসেব নেওয়ার হুঁশিয়ারি। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা তৃণমূল আটকে রাখছে বলে দাবি প্রধানমন্ত্রীর। তাঁর নতুন স্লোগান— ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’।
মমতার পাল্টা হুঙ্কার
মমতার দাবি, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন-এর নামে কেন্দ্রীয় সরকার বিজাতীয়দের ঢোকানোর আর প্রকৃত ভোটারদের বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর বঙ্গ সফর নিয়ে যে সৌজন্যের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তাকে বিজেপি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে দাবি দিদির। ইডি-সিবিআই দিয়ে দল ভাঙানোর রাজনীতির বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাংলার মেয়ে’র আবেগকেই হাতিয়ার করেছেন।
সত্য-মিথ্যা ও বাস্তবতার গোলকধাঁধা
মোদির সব কথাই কি ধ্রুব সত্য? নাকি রাজনীতির অতিরঞ্জন? সীমান্ত এলাকায় জনসংখ্যার পরিবর্তন নিয়ে বিজেপির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে ‘হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে’ এই দাবিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকটা অতিশয়োক্তি হিসেবেই দেখছেন। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা নিয়ে দুই সরকারের দড়ি টানাটানি চলছে বছর তিনেক ধরে। সত্যটা হল, দুর্নীতির অভিযোগে যেমন কেন্দ্র টাকা আটকেছে, তেমনি সাধারণ মানুষ সেই রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এনসিআরবি-র রিপোর্ট আর সাম্প্রতিক কিছু অপরাধের ঘটনাকে ঢাল করে বিজেপি যখন ‘জঙ্গলরাজ’ বলছে, তখন মমতা পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে।
কে কতটা প্রস্তুত? তুল্যমূল্য বিচার
তৃণমূলের বড় শক্তি তাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ অন্যান্য সামাজিক প্রকল্প। তৃণমূলের সংগঠন পাড়ায় পাড়ায় জালের মতো ছড়িয়ে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং বাঙালি আবেগ এখনও তাদের তুরুপের তাস। তবে একটানা ১৫ বছরের শাসনজনিত ক্লান্তি, দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ এবং নেতাদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তৃণমূলের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির ইমেজ এবং হিন্দুত্বের মেরুকরণই বিজেপির প্রধান পুঁজি। এছাড়া বিরোধী শিবিরের বড় শক্তি এখন শুভেন্দু অধিকারীর লড়াকু মেজাজ। ব্রিগেডের ভিড় প্রমাণ করেছে, বিজেপি বিরোধী ভোট এককাট্টা হচ্ছে। তবে রাজ্য স্তরে মমতার সমতুল কোনও মুখ না থাকা এবং তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের নিয়ে আদি-নব্য দ্বন্দ্ব বিজেপির বড় মাথাব্যথা।
পাল্লা ভারী কার?
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে লড়াই কিন্তু ফিফটি-ফিফটি। ব্রিগেডে মোদির সভা ঝটকা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাংলার গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক এখনও মমতার জনমোহিনী প্রকল্পের ওপর ভরসা রাখছে। বিজেপি যদি মেরুকরণ আর উন্নয়নের মিশেল দিতে পারে, তবে তৃণমূলের কপালে দুঃখ আছে। আবার তৃণমূল যদি ‘বহিরাগত’ বনাম ‘ঘরের মেয়ে’ আবেগ আর SIR-এর ভয়কে কাজে লাগাতে পারে, তবে নবান্নের দখল তাদের হাতেই থেকে যাবে। লড়াইটা এখন আর শুধু উন্নয়নের নয়, লড়াইটা অস্তিত্বের এবং পরিচয়ের রাজনীতির। মোদি ব্রিগেড জয় করেছেন গর্জনে, মমতা ময়দান সামলাচ্ছেন আবেগ আর সংগঠনে। তবে বাংলার রাজনীতিতে আবেগ আর পাটিগণিত সব সময় সমান্তরাল চলে না। বিজেপি এখন ইস্যু আর বক্তৃতা-র রাজনীতিতে এগিয়ে। ব্রিগেডের ভিড় প্রমাণ করে যে মানুষ বিকল্প খুঁজছে। কিন্তু, বুথ ম্যানেজমেন্ট বা সংগঠন ধরে রাখার ক্ষেত্রে তৃণমূল এখনও অনেক বেশি পোক্ত। যদি ভোট কেবল দুর্নীতি আর হিন্দুত্ব-এর ওপর হয়, তবে মোদির ব্রিগেডের প্রভাব বুথ পর্যন্ত পৌঁছবে। কিন্তু যদি ভোট হয় পকেটের টান আর সামাজিক সুরক্ষা-র ওপর, তবে মমতার প্রকল্পগুলোই শেষ কথা বলবে। আসল লড়াইটা হবে ২০২৬-এর আগে এই দুইয়ের মাঝখানের নিরপেক্ষ ভোটারদের নিয়ে। যারা মোদির ভাষণ শুনে হাততালি দেয়, কিন্তু মাসের শেষে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মেসেজ দেখে স্বস্তি পায়। এই দোদুল্যমান ভোট যেদিকে যাবে, নবান্ন সেদিকেই ঝুঁকবে। তবে বাংলার ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝা মানে এক অতলান্ত সমুদ্রের গভীরে ঢোকা। এখানে ভোট শুধু ইভিএমের বোতাম টেপা নয়, এখানে ভোট হল অস্তিত্ব, আবেগ এবং আহারের এক জটিল সংমিশ্রণ।
মোদির ব্রিগেডের প্রভাব কি বুথ পর্যন্ত পৌঁছবে?
মোদির ব্রিগেডে যে জনসমাগম হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের চাঙ্গা করবে। মোদি যে জনবিন্যাস পরিবর্তন বা অনুপ্রবেশ-এর কথা বলেছেন, তা সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে এবং মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যদি এই বক্তব্য বুথ স্তরে পৌঁছয়, তবে হিন্দু ভোট এককাট্টা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, যা বিজেপির বড় প্লাস পয়েন্ট। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর সক্রিয়তা এবং দুর্নীতির অভিযোগ যদি সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে যায়, তবে মোদির ‘ক্লিন ইমেজ’ বুথ স্তরে পরিবর্তনের হাওয়া তুলতে পারে।
মমতার সমাজকল্যাণ প্রকল্প কি ‘গেম চেঞ্জার’?
বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় ঢাল হল তাঁর তৃণমূল স্তরের কানেক্টিভিটি এবং সরাসরি উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছনো। গ্রামবাংলার একটা বিশাল অংশের মহিলাদের কাছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি নিশ্চিত আয়। এই মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ভাঙা বিজেপির জন্য হিমালয় জয়ের মতো কঠিন। মোদিকে বহিরাগত এবং মমতাকে ঘরের মেয়ে হিসেবে তুলে ধরার যে কৌশল তৃণমূল নিয়েছে, তা বুথ স্তরে বাঙালি আবেগকে উসকে দেয়। মানুষ যখন উন্নয়নের চেয়ে নিজের অস্তিত্ব বা পরিচয়কে বড় করে দেখে, তখন মমতার পাল্লা ভারী হয়।
‘উপভোক্তা’ মনস্তত্ত্ব বনাম ‘নাগরিক’ অধিকার
তৃণমূলের সবচেয়ে বড় শক্তি হল তারা ভোটারকে উপভোক্তা হিসেবে দেখতে শিখিয়েছে। গ্রামবাংলার একজম মহিলার কাছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা স্বাস্থ্যসাথী কেবল সরকারি প্রকল্প নয়, এটি তার আত্মসম্মান এবং আর্থিক স্বাধীনতার চাবিকাঠি। এই ভোটাররা যখন বুথে যান, তখন তাদের মাথায় থাকে, সরকার আমাকে দিচ্ছে, আমি কেন দেব না? মোদি যখন দুর্নীতির কথা বলেন, তখন নাগরিক হিসেবে মানুষ ক্ষুব্ধ হয় ঠিকই, কিন্তু যখন প্রশ্ন ওঠে বিজেপি এলে কি এই টাকা পাওয়া যাবে? তখনই একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিজেপি যদি এই নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তবে স্রেফ দুর্নীতির অভিযোগে মমতা-দুর্গ ভাঙা কঠিন।
‘ঘরের মেয়ে’ বনাম ‘বহিরাগত’ তত্ত্বের প্রভাব
বাঙালি মনস্তত্ত্বে একটা প্রচ্ছন্ন উপজাতীয়তাবাদ কাজ করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যে, মানুষ তাঁকে পরিবারের সদস্য মনে করে। তাঁর সাধারণ শাড়ি, হাওয়াই চটি আর লড়াকু ভঙ্গি সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটা মানসিক সেতু তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী মোদি বা অমিত শাহ যখন ব্রিগেডে আসেন, তাঁদের বিশাল রাজকীয় আয়োজন আর হিন্দি আধিপত্য অনেক সময় সাধারণ বাঙালির মনে দূরত্ব তৈরি করে। বিজেপি যতক্ষণ না একজন খাঁটি বাঙালি মুখকে সামনে রেখে মমতার সমতুল আবেগ তৈরি করতে পারছে, ততক্ষণ মোদি-ম্যাজিক কেবল শহরের শিক্ষিত বা হিন্দিভাষী বলয়েই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থাকে।
হিন্দুত্ব বনাম লোকায়ত সংস্কৃতি
বাংলার হিন্দুত্ব উত্তর ভারতের মতো নয়। এখানে রামের চেয়ে দুর্গাপুজো বা কালীপুজোর দাপট বেশি। বিজেপি চেষ্টা করছে লোকায়ত হিন্দু আবেগকে রাজনৈতিক হিন্দুত্বে রূপান্তর করতে। মোদি ব্রিগেডে যে জনবিন্যাস পরিবর্তন-এর ভয় দেখিয়েছেন, তা মূলত প্রান্তিক হিন্দুদের মনে একটা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করার চেষ্টা। মমতা নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করার জন্য মন্দিরে মন্দিরে ঘুরছেন, পুরোহিত ভাতা দিচ্ছেন। তিনি দেখাতে চাইছেন, আমিও হিন্দু, কিন্তু আমি বিভাজনের রাজনীতি করি না। এই নরম হিন্দুত্ব বিজেপির কট্টর হিন্দুত্বকে ভোঁতা করে দিচ্ছে।
দাঁড়িপাল্লায় নিরপেক্ষ বিচার
মহিলা ভোটাররা সামাজিক সুরক্ষা ও হাতখরচের নিশ্চয়তা চান। তৃণমূল এগিয়ে। তরুণ ও কর্মহীনরা চাকরি ও কলকারখানার অভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ। এগিয়ে বিজেপি। সংখ্যালঘু ভোটাররা অস্তিত্বের প্রশ্নে এনআরসি-র ভয়ে ভীত। তৃণমূল এখানে সংহত। মধ্যবিত্ত ও শহুরে মানুষ দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট-রাজ নিয়ে অতিষ্ঠ। বিজেপি এখানে শক্তিশালী।

