
ভোটের আগে নীরব এক ঝড় বইছে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক অন্দরে। বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও, ভিতরে জমছে ক্ষোভ, বাড়ছে অসন্তোষ আর সেই কেন্দ্রবিন্দুতে দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ সংস্থা নির্বাচন কমিশন। অভিযোগ উঠছে, একের পর এক বদলি ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে ডব্লিউবিসিএস আধিকারিকদের ‘ডিমোশন’ করা হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক শীর্ষ আইএএস ও আইপিএস আধিকারিককে সরিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজি, এমনকি কলকাতা পুলিশের কমিশনার প্রায় ৬০-৭০ জন অফিসারকে বদলি করা হয়েছে। অনেককে আবার রাজ্যের বাইরেও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে ডব্লিউবিসিএস (এক্সিকিউটিভ) ক্যাডারের অফিসারদের নতুন পোস্টিং নিয়ে।
অভিযোগ, বহু সিনিয়র আধিকারিককে তাঁদের পদমর্যাদার তুলনায় অনেক নিচু বা কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। যেমন, ডব্লিউবিসিএস সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সৈকত আশরাফ আলিকে মালদহে রুরাল ডেভেলপমেন্ট সেলের প্রজেক্ট ডিরেক্টর করা হয়েছে যেখানে তাঁকে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র অফিসারের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে বলেই জানা গিয়েছে। একইসঙ্গে তাঁকে মালতীপুর বিধানসভার রিটার্নিং অফিসারও করা হয়েছে।
একই ছবি দেখা গিয়েছে অন্য ক্ষেত্রেও। হরিণঘাটার অতিরিক্ত জেলাশাসক মৈত্রেয়ী চক্রবর্তীকে জেলা যুব আধিকারিক পদে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ। আরও একাধিক অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিব পর্যায়ের আধিকারিকদেরও তুলনামূলক নিম্নপদে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। এখানে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলে শাসকদল। ডেপুটি সচিব পর্যায়ের এক আধিকারিককে এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে বসানো হয়েছিল, যা প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে বলে দাবি ওঠে। পরে সেই নিয়োগে পরিবর্তনও আনা হয়।
এদিকে, রাসবিহারী কেন্দ্রেও সিনিয়র অফিসার উত্তমকুমার মণ্ডলকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশাসনিক কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলেই মত অনেকের।
এই সমস্ত ঘটনার জেরে প্রশাসনের অন্দরে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। এক প্রবীণ আধিকারিকের কথায়, “এখন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মানা ছাড়া উপায় নেই। তবে ভোটের পর এই সব বদলির পেছনের বাস্তবতা সামনে আসতে পারে।”
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনা ছাড়াই এই বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অতীতের প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
ভোটের আগে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও কাঠামোগত ভারসাম্য নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে। এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটাই দেখার।
