
শনিবার পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে তৃণমূল সুপ্রিমো তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণ ছিল মূলত মসনদে টিকে থাকার লড়াইয়ের ওপর। তাঁর বার্তায় যেটা বারবার উঠে এসেছে তা হল বিরোধী দলকে আক্রমণ করা। রাজনীতি- মানে উন্নতী নাকি ক্ষমতার লড়াই? এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা আজ নেই বললেই চলে। ওলিতে গলিতে হোক বা বড় বড় মঞ্চ বানিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি যে সভা করে সেখানে মানুষের সুবিধার থেকে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা বা মসনদ জয়ের চেষ্টার গন্ধ বেশি পাওয়া যায়। এই ভাবধারার ব্যতীক্রমী তৃণমূল সুপ্রিমোও নন। এবিষয়ে নেতা-মন্ত্রীদের বক্তব্য একটাই, যে তাঁরা মানুষের জন্য কাজ করতে চায়, বিপক্ষ তা চায় না তাই তাঁরা বিরোধীতার পথ অবলম্বন করেছে। কিন্তু বিজেপি রাজ্যের মসনদ না দখল করার আগেই গেরুয়া শিবিরকে নির্মূল করতে চাইছে তৃণমূল!

এদিনের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এসআইআর ইস্যুকে একটু উস্কে দিয়ে বিজেপিকে নিশানা করে মমতা বলেন, এসআইআর-এর মাধ্যমে তিনি কাউকে তাড়াতে দেবেন না। তার আগে বাংলা থেকে বিজেপিকে তাড়াবেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে বাংলায় তো এখনও ক্ষমতা দখল করতে পারেনি বিজেপি, তাঁর আগেই এত ভয় তৃণমূলের? আজ সভামঞ্চে ঠিক কোন কোন বিষয়ের ওপর জোর দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো।

যাইহোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শনিবারের ভাষণের কিছু অংশের ওপর দৃষ্টিপাত করা যাক। প্রথমত, যেখানে বারংবার রাজ্যের বিরোধী দলের ওপর ধর্মীয় বিভাজনের অভিযোগ ওঠে, সেখানে মঞ্চে তৃণমূল সুপ্রিমো জনগনের মাঝে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেন। এবারেও তেমনই দৃশ্য দেখা গিয়েছে। রঘুনাথপুরের সভায় তিনি বিরোধী পক্ষকে আক্রমণ করে বলেন, ‘‘কেউ যদি বলে টাকার বিনিময়ে দেশ বিক্রি করব, ধর্ম বিক্রি করব, জাত বিক্রি করব, পরিষ্কার বলি, ধর্ম একটাই, মানব ধর্ম। যখন রক্তদান শিবির হয়, সেখানে সকলে রক্ত দেন। বোতলে তাঁর নাম, জায়গা লেখা থাকে। যখন তা ব্যাঙ্কে জমা পড়ে, তখন তাতে কারও নাম লেখা থাকে না। যখন রক্ত নেন, তখন কি খবর নেন! তার জাত কী? ধর্ম কী? সব কর্মসূচিতে জনজাতিদের নিয়ে যাই। ছটের উপবাস করি। বাবা-মা শিখিয়েছে।’’ স্বাভাবিক ভাবে বলা বাহুল্য যে তিনি সর্বধর্মের ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

বিজেপি প্রতি সাধারণ মানুষের বিস্বাসের খুঁটিকে একটু নাড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘বিজেপি যদি বলে, ৩০০০ টাকা দেব, বিশ্বাস করবেন? বুলডোজার চলবে। বেটি বঁচাও বেটি পড়াও বলেছিল। কেউ পায়নি। করে লুট, বলে ঝুট। সকলের উপরে অত্যাচার করে। বলে, মাছ খাবে না। বিজেপির রাজ্যে মাছ, মাংস, ডিম খেতে দেয় না। বাংলা ভাষায় কথা বললে অত্যাচার করা হয়।’’

এদিন তিনি তাঁর প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘মা-বোনেরা বলুন? বিনা পয়সায় রেশন, লক্ষ্মীর ভান্ডার, তফসিলি বন্ধু চান? ভাল ভাবে বাঁচতে চান? কর্ম চান? এখনও তালিকা বার করতে পারেনি।” কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যারা সাধারণ মানুষ, তাঁদের মাঝ থেকে বহু মানুষ বহুবার দাবি করেছেন, তাঁদের ভাতা চায় না, তাঁদের চাকরি চায়। পরিযায়ী না হয়ে পরিবারের কাছে থাকতে চায়। দয়ায় নয় নিজেদের চেষ্টায় আর্থীকভাবে সাবলীল হতে চায়। কিন্তু কোথায় কী কতটা পরিবর্তন হয়েছে সাধারণ মানুষের সেই চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে।

সাধারণ মানুষকে একপ্রকার সর্বহারার ভয় দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ভোটটা জোড়াফুলকে না দিলে বিজেপি সব কেড়ে নেবে। খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেবে। থাকা, কথা বলা বন্ধ করবে। উত্তরপ্রদেশে মেয়েরা থানায় ডায়েরি করতে পারে না। করতে গেলে পুড়িয়ে মারা হয়। এখানে একটা-দুটো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলে আমরা পদক্ষেপ করি। বিজেপি করে না। বড় বড় কথা বলে মুখে। আপনারা বিশ্বাস করেন? জঙ্গলমহলে শান্তি ফিরিয়ে আনব বলেছিলাম, এনেছি। যা বলেছি, করেছি। আমাদের কর্মীদের টাকা দেওয়ার চেষ্টা করবে না। লাভ নেই। সকালে জোট বেঁধে ভোট দিন। ভোটবাক্স রক্ষা করুন।’’ কিন্তু এখনও কি রাজ্যের প্রত্যেকটা মানুষ নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে? দিনের আলোয় খুন-ধর্ষণের মতো ঘটনা উঠে আসে খবরের শিরোনামে। কিন্তু অপরাধীদের যথাযথ সাজা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় মানুষকে। কোথাও তাঁরা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে মনে হয়।

এছাড়াও কোনও দলকে আক্রমণ না করে কিছু কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সব কথার মূল উদ্দেশ্য বিজেপিকে বাংলায় টিকতে না দেওয়া। বাংলার মসনদে একমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসকে বসার জায়গা করে দেওয়া। সেই মসনদ আবারও জয় করতে সাধারণ মানুষের সামনে বিভিন্ন প্রকল্পের ডালা লোভনীয় ভাবে সাজিয়ে রেখেছে তারা। কিন্তু তাতে কতটা উপকার হচ্ছে সাধারণ মানুষের তা প্রশ্ন রেখেই যায়।
