
দিব্যেন্দু ঘোষ
৩১শে মার্চ, ‘আন্তর্জাতিক রূপান্তরকামী দৃশ্যমানতা দিবস’ (International Transgender Day of Visibility)। বিশ্বজুড়ে যখন লিঙ্গবৈচিত্র্য এবং রূপান্তরকামী (Transgender) মানুষের অধিকার, অস্তিত্ব ও দৃশ্যমানতাকে সম্মান জানানো হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে ভারতের প্রেক্ষাপটে এক গভীর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে আসছে। মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিযোগ, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের ধারাবাহিক নীতি এবং আইনি পদক্ষেপগুলি রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের জন্য কার্যত মৃত্যু পরোয়ানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরম আইনি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার হরণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই মৃত্যু পরোয়ানার প্রথম ধাপটি রচিত হয়েছিল ‘রূপান্তরকামী ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) আইন, ২০১৯’ পাসের মধ্য দিয়ে। ২০১৪ সালের ঐতিহাসিক ‘নালসা’ (NALSA) রায়ে সুপ্রিম কোর্ট রূপান্তরকামীদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং লিঙ্গ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ (Right to Self-determination) প্রদান করেছিল। কিন্তু বিজেপি সরকারের আনা ২০১৯ সালের আইনটি সেই রায়কে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করেছে। এই আইনে নিজের লিঙ্গপরিচয় প্রমাণের জন্য রূপান্তরকামীদের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এবং মেডিক্যাল স্ক্রিনিংয়ের মুখাপেক্ষী হতে হয়, যা চরম অবমাননাকর।
অমানবিক আইনি বৈষম্য
সরকারের নীতির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি হল রূপান্তরকামীদের প্রতি হওয়া হিংসার বিচার। ভারতীয় দণ্ডবিধিতে যেখানে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনের শাস্তি যাবজ্জীবন বা ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে ২০১৯ সালের আইনে একজন রূপান্তরকামী ব্যক্তির ওপর যৌন বা শারীরিক নির্যাতনের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ছয় মাস থেকে দু’বছর। বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও রূপান্তরকামী নেত্রী আক্কাই পদ্মশালী সরকারের এই নীতির কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, ‘সরকার আমাদের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করেছে মাত্র দুই বছর! এটি আমাদের সুরক্ষার বদলে আমাদের পরিচয়কে আমলাতন্ত্রের খাঁচায় বন্দি করেছে। অপরাধীদের জন্য লঘু শাস্তির এই বিধান আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য সরাসরি এক মৃত্যু পরোয়ানা, যা প্রমাণ করে এই রাষ্ট্রের চোখে আমাদের জীবনের কোনও মূল্য নেই।’
অর্থনৈতিক বঞ্চনা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের আরেকটি বড় বঞ্চনা হল শিক্ষাক্ষেত্রে ও চাকরিতে ‘অনুভূমিক সংরক্ষণ’ (Horizontal Reservation) না দেওয়া। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সরকার রূপান্তরকামীদের জন্য আলাদা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করে, তাদের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (OBC) কাঠামোর ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর ফলে দলিত ও আদিবাসী রূপান্তরকামীরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে এই সম্প্রদায়ের মানুষকে আজও বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বা যৌনপেশায় যুক্ত থাকতে হচ্ছে। বিশিষ্ট দলিত-রূপান্তরকামী অধিকারকর্মী গ্রেস বানু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘অনুভূমিক সংরক্ষণ আমাদের প্রতি কোনও দয়া নয়, এটি আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বর্তমান সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ভাতে মারার নীতি গ্রহণ করেছে। দৃশ্যমানতা দিবসে রাষ্ট্র আমাদের শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখানোর বস্তু করে রেখেছে, কিন্তু সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অর্থনৈতিক অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছে।’
আদর্শগত সংঘাত ও স্বাস্থ্যখাতে বঞ্চনা
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপি সরকারের হিন্দুত্ববাদী আদর্শে পিতৃতন্ত্র এবং বাইনারি (নারী-পুরুষ) লিঙ্গকাঠামোর ওপরই জোর দেওয়া হয়। সেখানে লিঙ্গবৈচিত্র্য বা কুইয়ার (Queer) সম্প্রদায়ের অধিকার সবসময়ই ব্রাত্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে লিঙ্গ-নিশ্চিতকরণ সার্জারি (Gender Affirming Care) বা রূপান্তরকামীদের সংবেদনশীল চিকিৎসার অভাব রয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলা এবং সামাজিক হেনস্থার কারণে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মহত্যার হারও উদ্বেগজনক। সমকামী বিবাহে আইনি স্বীকৃতি দিতে সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র বিরোধিতাও তাদের এই মনস্তত্ত্বেরই প্রমাণ। বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী আনন্দ গ্রোভারের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘সরকার যখন আইন করে কোনও প্রান্তিক গোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারগুলোকে সংকুচিত করে এবং তাদের প্রতি হওয়া অপরাধকে লঘু করে দেখায়, তখন তা প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার শামিল হয়ে ওঠে।’
২০১৪ সালের আশা, ২০২৩ সালের হতাশা
রূপান্তরকামীদের আইনি অধিকারের মূল ভিত্তি হল সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪ সালের ঐতিহাসিক ‘নালসা’ (NALSA) রায়, যেখানে তাদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল শিক্ষা ও চাকরিতে তাদের সংরক্ষণ দিতে হবে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ২০১৯ সালের আইনে সেই রায়কে লঘু করে দেয়। ২০২৩ সালে সমকামী ও রূপান্তরকামী বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার মামলায় (Supriyo v. Union of India) সুপ্রিম কোর্টের রায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আদালত বিবাহকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়। কিন্তু এই মামলায় কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র বিরোধিতা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার আদালতে হলফনামা দিয়ে জানায়, এই অধিকারের দাবি কেবল ‘শহুরে অভিজাতদের’ (Urban Elitist) এবং এটি ‘ভারতীয় পারিবারিক মূল্যবোধের’ পরিপন্থী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই যুক্তি আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠের পপুলিজম এবং হিন্দুত্ববাদী পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোরই প্রতিচ্ছবি, যা লিঙ্গবৈচিত্র্যকে মান্যতা দিতে নারাজ।
বম্বে ও রাজস্থান হাইকোর্ট
নালসা রায়ের পর সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানের অধিকার সুনিশ্চিত করতে হাইকোর্টগুলোই এখন মূল যুদ্ধক্ষেত্র। মহারাষ্ট্র পুলিশ নিয়োগে তৃতীয় লিঙ্গের কোনও বিকল্প না থাকায় বম্বে হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রূপান্তরকামীদের অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য করে। একই ছবি রাজস্থানে। রাজস্থান হাইকোর্ট গঙ্গা কুমারী নামে এক রূপান্তরকামী নারীর মামলায় এক ঐতিহাসিক রায় দেয়, যেখানে পুলিশ কনস্টেবল পদে তাঁর নিয়োগ আটকে রাখার জন্য রাজ্য সরকারকে তুলোধোনা করা হয় এবং তাঁকে নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়গুলো সরকারের আমলাতান্ত্রিক অসহযোগিতা এবং সদিচ্ছার অভাবকেই নগ্ন করে দেয়। আদালতকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে সরকারের তৈরি করা বাধা ডিঙানোর জন্য।
কলকাতা ও এলাহাবাদ হাইকোর্ট
কলকাতা হাইকোর্ট রূপান্তরকামীদের অধিকার রক্ষায় একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ করেছে। জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা টেট (TET) পরীক্ষায় তৃতীয় লিঙ্গের অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ থেকে শুরু করে, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্ট বরাবরই কড়া অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশের মতো রক্ষণশীল রাজ্যে এলাহাবাদ হাইকোর্ট একাধিক যুগান্তকারী রায়ে জানিয়েছে, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি (তাঁরা সমকামী বা রূপান্তরকামী যাই হোন না কেন) যদি একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তবে পরিবার বা সমাজ তাঁদের হয়রানি করতে পারে না এবং রাষ্ট্র তাঁদের পুলিশি সুরক্ষা দিতে বাধ্য।
ভাল-মন্দের বিচার
সরকারের নীতির সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, সমাজ কাঠামোর রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। সরকারের নীতি হল পর্যায়ক্রমিক। ২০১৯ সালের আইনে অন্তত রূপান্তরকামীদের সুরক্ষার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে এবং সরকার ‘গরিমা গৃহ’-র মতো প্রকল্প এনেছে। তাঁদের মতে, ভারতের মতো ঐতিহ্যবাহী সমাজে আদালতের অতিসক্রিয়তার চেয়ে সংসদের মাধ্যমে আইন তৈরি হওয়া বেশি গণতান্ত্রিক। কিন্তু অধিকারকর্মী ও সমালোচকদের যুক্তি অত্যন্ত ঝাঁঝালো। তাঁদের মতে, এটি কোনও পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন নয়, বরং সুকৌশলে অধিকার হরণ। আদালত যখন রায় দিয়ে বলছে রূপান্তরকামীদের বেঁচে থাকার, চাকরি পাওয়ার এবং ভালবাসার অধিকার আছে, তখন সরকার সেই রায়গুলো কার্যকর না করে দিনের পর দিন ফেলে রাখছে। নালসা রায়ের এক দশক পরেও অনুভূমিক সংরক্ষণ (Horizontal Reservation) লাগু হয়নি। সরকারের এই নীতি আসলে গভীর আদর্শগত মনস্তত্ত্বের ফসল। যেখানে রাষ্ট্র মনে করে নারী ও পুরুষের চিরাচরিত কাঠামোর বাইরের যে কোনও অস্তিত্বই ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতি’।
উচ্চ আদালতগুলি রূপান্তরকামীদের জন্য যে আইনি রক্ষাকবচ তৈরি করছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আদালত কেবল পথ দেখাতে পারে, কিন্তু সেই পথে হাঁটার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের বর্তমান অবস্থান প্রমাণ করে যে, দৃশ্যমানতা দিবসের এই উদযাপন আসলে রাজনৈতিক মরীচিকা। আইনি অধিকারের মোড়কে এই যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা, তা রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের বুকে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের ছুড়ে দেওয়া এক অদৃশ্য মৃত্যু পরোয়ানা ছাড়া আর কিছুই নয়। যতদিন না অনুভূমিক সংরক্ষণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হচ্ছে, ততদিন এই সাংবিধানিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।

