
২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন এখন দোরগোড়ায়। এপ্রিল মাসের ২৩ ও ২৯ তারিখ, দুই দফায় ভোটগ্রহণের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ফল প্রকাশ ৪ঠা মে। গত কয়েক দশকের মধ্যে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র এতটা জটিল এবং বহুমুখী লড়াইয়ের মুখে আগে কখনও পড়েনি।
একদিকে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই চালাচ্ছে, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী শক্তি বিজেপির ক্ষমতা জয়ের আকাঙ্খা। আর বাম, কংগ্রেসের লড়াই সহ নতুন জনতা উন্নয়ন পার্টির উথ্থান তো রয়েছে। জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান অর্থাৎ হুমায়ুন কবিরের ভোট বক্সে সংখ্যালঘু ভোটের প্রভাব কি হতে পারে তা নিয়েও গুঞ্জন উঠছে। সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতি এখন দারুণ উতপ্ত।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস টানা চতুর্থবারের জন্য ক্ষমতায় ফিরতে মরিয়া। দলের মূল শক্তি সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো, যেমন—লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্য সাথী এবং কন্যাশ্রী। তা নিয়ে বারবার ভোটারদের মন ছোঁয়ার চেষ্টা করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ তাঁর দল। ভোটের প্রচারে গিয়ে সব সভায় তৃণমূল সুপ্রিমোর কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে, এই বাংলা কন্যাশ্রীর, এই বাংলা যুবশ্রীর ইত্যাদি। এসবের জেরে বলাই বাহুল্য যে, গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কে বিশেষ করে মহিলা ভোটব্যাঙ্কে তৃণমূলের আধিপত্য এখনও অটুট।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আরজি কর কাণ্ডের মতো কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে, নাগরিকরা যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল বা তামান্নার মৃত্যু বা সন্দেশখালির মতো পুরনো ঘটনা যে বিতর্ক তৈরি করেছে, তা শাসক দলের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওয়াকিবহাল মহল। শহর ও মফস্বলে ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া মোকাবিলা করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও সেই পুরনো ‘বাঙালি অস্মিতা’ এবং ‘বহিরাগত’ তত্ত্বকেই হাতিয়ার করছেন। সেই সঙ্গে সম্প্রতি তাঁর ঘোষণা করা যুবসাথী-র মতো প্রকল্পকে অনেকেই প্রভাবিত হয়েছেন বলে অনুমান করছে অনেক।
এদিকে ২০২১ সালের তুলনায় বিজেপি এবার আরও সুসংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর লড়াকু মেজাজ এবং কেন্দ্রের মোদী সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রচারকে সম্বল করে এগোচ্ছে গেরুয়া শিবির। বারবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের বঙ্গ সফর, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ডব্বল টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, কর্ম সংস্থানের প্রতিশ্রুতি প্রমুখ বেশ নজর কাড়ছে। সম্প্রতি টেনিস তারকা লিয়েন্ডার পেজের বিজেপিতে যোগদান বা একাধিক তারকা মুখের উপস্থিতি প্রচারের চাকচিক্য বাড়িয়েছে তারা।
বিজেপির মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক এবং উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো জয় করতে যথেষ্ট নজর দিয়েছে। ৩১ মার্চের যে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে বিজেপি সেখানে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী প্রার্থী হয়েছেন। তা মতুয়া ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে তা সময় বলবে।
২০২১-এ শূন্য হাতে ফেরার পর ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বামেদের ভোট শতাংশ কিছুটা বেড়েছিল। ২০২৬-এ মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, দীপ্সিতা ধর বা সৃজন ভট্টাচার্যের মতো তরুণ মুখদের সামনে রেখে বামেরা এবার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছে। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতো তরুণ নেতাদের জনসভাগুলোতে ভিড় বাম শিবিরের কর্মীদের চাঙ্গা করেছে। এদিকে সিপিএম-এর দাপুটে নেতা প্রতিক উরের দল বদলের ঘটনাও রয়েছে। যাইহোক, সব মিলিয়ে বামেদের ভাগ্যে কতটা শিকে ছিঁড়বে তা ৪ঠা মে দেখা যাবে।
প্রত্যেক নির্বাচনের মতো এবারের নির্বাচনও কেবল জনগনের জন্য লড়াই নয়, এটা ক্ষমতা জয়ের লড়াই বেশি। তৃণমূলের যেমন সিংহাসন ধরে রাখার লড়াই। তেমনই বিজেপির সামনে তেমনি রয়েছে প্রথমবারের মতো নবান্ন দখলের স্বপ্ন। আর এসবের মধ্যে উঠছে সঠিকভাবে ভোট হবে নাকি ভোট চুরি হবে।
