
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল শিবিরের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এক চরম উত্তজনাপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা ইরানি বন্দরগুলো অবরোধ করার সিদ্ধান্তে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নাভিশ্বাস দশা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের মিত্র আমেরিকার ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করেছে সৌদি আরব। রিয়াদের আশঙ্কা, ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকেও বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।
‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানি বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়ার এবং আলোচনার টেবিলে ফেরার জন্য চাপ দিচ্ছে। রিয়াদের প্রধান দুশ্চিন্তা, আমেরিকা যদি ইরানের বন্দরগুলো পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে তেহরান পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে।
বর্তমানে হরমোজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সৌদি আরব মরুভূমির মধ্য দিয়ে পাইপলাইনের সাহায্যে লোহিত সাগরে তেল পাঠিয়ে দিনে প্রায় ৭০ লক্ষ ব্যারেল রপ্তানি বজায় রাখছে। কিন্তু বাব আল-মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে সৌদির সেই বিকল্প পথটিও রুদ্ধ হয়ে যাবে।
ইয়েমেনের বাব আল-মান্দেব প্রণালীর উপকূলীয় এলাকা ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। আরব কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান এখন হুথিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যাতে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দেয়। ওয়াশিংটনের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নিউ আমেরিকা’-র বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন জানান, গাজা সংকটের সময় হুথিরা প্রমাণ করে দিয়েছে যে এই জলপথ অবরুদ্ধ করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার বিদেশ নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা আলি আকবর বেলায়েতি গত ৫ এপ্রিল এক বার্তায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “হোয়াইট হাউস যদি তাদের বোকামি চালিয়ে যায়, তবে তারা দ্রুত বুঝতে পারবে যে বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ কেবল একটি সংকেতেই স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে।” ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে ইরানের বন্দর নিরাপদ না থাকলে ওই অঞ্চলের কোনও বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।
গত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিকাঠামোর ভঙ্গুরতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। ইরানের অবরোধের কারণে দিনে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ ব্যারেল তেলের জোগান বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য দাবি করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমোজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে বদ্ধপরিকর এবং তাঁরা উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কিন্তু রিয়াদের বর্তমান অবস্থান প্রমাণ করছে যে, সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকট সমাধানের মার্কিন প্রচেষ্টায় মিত্রদের পূর্ণ সমর্থন নেই।
বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কাতারের মতো দেশগুলোর মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা ছিল যে, তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ক কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় আঞ্চলিক অর্থনীতি এক বিধ্বংসী ধাক্কার সম্মুখীন।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন একদিকে যেমন ইরানের কব্জায় নিজেদের অর্থনৈতিক লাইফলাইন দেখতে চায় না, তেমনই যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে তারা আমেরিকাকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য জোরাল অনুরোধ জানাচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে শান্তি না ফিরলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এক ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
