প্রি-ডায়াবেটিস এমন একটি অবস্থা যেখানে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে, তবে তা এখনো টাইপ-২ ডায়াবেটিস পর্যায়ে পৌঁছেনি। এটি মূলত ডায়াবেটিসের পূর্বাভাস হিসেবে কাজ করে এবং সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জীবনধারার পরিবর্তন আনতে পারলে এই অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
এই সমস্যার প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে ওজন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাওয়া অন্যতম। অনেক সময় শরীরের মেটাবলিজম সঠিকভাবে কাজ না করায় ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা ইনসুলিন প্রতিরোধের সংকেত হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত তৃষ্ণা অনুভব করা এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়াও প্রি-ডায়াবেটিসের লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। যখন শরীর ইনসুলিনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন কিডনি অতিরিক্ত গ্লুকোজ বের করার জন্য বেশি প্রস্রাব তৈরি করে, ফলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং তৃষ্ণার অনুভূতি বেড়ে যায়।
অনেকের ক্ষেত্রেই ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা যায়, যা সাধারণত রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামার কারণে হয়। ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ না করলে শরীরের কোষগুলো পর্যাপ্ত শক্তি পায় না, ফলে শরীর দুর্বল অনুভব করে এবং অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্তি আসতে পারে। পাশাপাশি, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া প্রি-ডায়াবেটিসের অন্যতম লক্ষণ। রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে তা ধমনী এবং স্নায়ুর কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশের ক্ষত সহজে শুকাতে চায় না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জীবনধারার পরিবর্তন আনলেই এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রথমেই শরীরচর্চার প্রতি মনোযোগী হওয়া জরুরি। নিয়মিত ব্যায়াম করলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে, ফলে শরীর সহজেই রক্তে থাকা অতিরিক্ত গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে। হাঁটা, জগিং, যোগব্যায়াম বা সাইক্লিং প্রি-ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে ফলমূল, শাকসবজি, সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার এবং প্রোটিনযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। পাশাপাশি, পর্যাপ্ত ঘুম নেওয়াও জরুরি, কারণ কম ঘুম শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিও উপেক্ষা করা উচিত নয়। অতিরিক্ত ওজন ইনসুলিন প্রতিরোধ বাড়িয়ে দেয়, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা আরও বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এছাড়া, মানসিক চাপও প্রি-ডায়াবেটিসের একটি বড় কারণ হতে পারে। বেশি মানসিক চাপ থাকলে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ধ্যান, যোগব্যায়াম বা অন্যান্য রিল্যাক্সেশন কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, যদি প্রি-ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। নিয়মিত রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করলে এই সমস্যার আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হয়। অনেক ক্ষেত্রেই, জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে পারলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে রূপান্তরের সম্ভাবনা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই সতর্কতা অবলম্বন করাই একমাত্র সমাধান।
