সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
যোগ্য চাকরি হারাদের চাকরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। নেতাজি ইনডোরের সভায় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আগে যোগ্যদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেব তারপর অন্যদের বিষয়টা ভাববো জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। যাদের অযোগ্য বলা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কি প্রমাণ আছে তা আমি দেখব তারপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করব বললেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিন নেতাজী ইন্ডোর সভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান “আপনারা যাতে আবার চাকরি ফিরে পান তার ব্যবস্থা প্রসেসের মধ্যে দিয়েই দু মাসের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে। যারা দশ বছর ধরে চাকরি করছেন তারা অতিরিক্ত ছাড় পাবেন। কারোর কাছে আমি ভিক্ষা চাই না আপনাদেরও ভিক্ষা করে খেতে হবে না। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি আমার কথা মানে কথা। যারা যোগ্য তারা নিশ্চিন্তে থাকুন ভট্টাচারুন আস্থা রাখুন চিন্তা করবেন না। যারা নির্দোষ তাদের চাকরি খাওয়ার অধিকার কারোর নেই, আদালতেরও নয়। আপনারা পড়াশুনা করুন আপনারা বাচ্চাদের মানুষ করুন আপনারা স্কুলে যান ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ান। ভলানটারিলি সার্ভিস করুন। আপনাদের অধিকার বিফলে যাবে না।” চাকরি হারা শিক্ষক শিক্ষিকাদের বলা হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন , একটি কলমের খোঁচায় যাদের জীবন সংকটে এসে দাঁড়িয়েছে আমি আজ তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। আমার হৃদয় পাথর নয়। আমাকে জেলে ভরে দিলেও আমি যেতে রাজি আছি। আমি আমার জীবনে জেনেশুনে কোন অন্যায় করিনি কোন চাকরি খাইনি। তাই আমি কাউকে জেলে পাঠাইনি।
“মানুষ যখন বিপদে পড়ে সেই মানুষগুলো লাল কি কালো অথবা সাদা তা দেখার দরকার নেই। তাদের জীবন, তাদের অস্মিতা, তাদের বঞ্চিত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সকলের।” ভরসা মমতার।
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, যারা যোগ্য যারা বঞ্চিত হয়েছেন তাদের দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। এখনো পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বলতে পারেনি কারা যোগ্য কারা অযোগ্য। কিন্তু যারা নির্দোষ তাদের শাস্তি দেওয়া যায় না এটাই আইনের বিধান। মমতার দাবি,২০২২ সাল থেকেই চাকরি খেয়ে নেওয়ার খেলা শুরু হয়েছে। প্রথমে অভিজিৎগঙ্গোপাধ্যায়ের বেঞ্চে একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর প্যানেল বাতিল করা হয়। এরপর ডিভিশন বেঞ্চে যায় মামলা। সেখানে সিবিআইকে তদন্তভার দেওয়া হয়। রাজ্য সরকার সিবিআই তদন্ত চাইনি বলেও জানান মমতা।
মুখ্যমন্ত্রী বক্তৃতা চলাকালীন ইনডোর স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অংশে বিরোধিতা শুরু করেন চাকরিহারারা। তাদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য “যার ইচ্ছে হবে শুনবেন না হলে চুপ করে বসুন। আমার কথা আমাকে বলতেই হবে। আমি শুধু গালাগাল খাবো এটা হতে পারে না। আমাকেও বলতে হবে যে আমরা কি কি করেছি। কাজ করতে গেলে দু-একটা ভুল হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই গোটা প্যানেল বাতিল করে দেওয়া মানতে পারিনি। আমি আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই। আমি বেঁচে থাকাকালীন যোগ্য কারো চাকরি খেতে দেব না এটা আমার কমিটমেন্ট।”
রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য একটা পরিকল্পনা চলছে বলে দাবি মুখ্যমন্ত্রীর। এই রায়ের পেছনে খেলা আছে বলেও জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। এই খেলাটা কে খেলছে সেটা খুঁজে বার করবই। আমি বেঁচে থাকতে কোনও যোগ্য প্রার্থীর চাকরি যাবে না, বরাভয় মুখ্যমন্ত্রীর।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন , সরকারকে যোগ্য ও অযোগ্য আলাদা করার সুযোগ আদালত দেয়নি। সুপ্রিম কোর্ট যোগ্য ও অযোগ্য আলাদা করে দেয়নি। সুপ্রিম কোর্ট ও আদালত যে যে কাগজপত্র এসএসসির কাছে চেয়েছিল আমরা সব কাগজপত্র তাদেরকে দিয়েছি। রাজ্য সরকার যে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন দাখিল করবেন আজ তা স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের কাছে যোগ্য ও অযোগ্যদের তালিকা চাওয়া হবে বলেও জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। আর এবারের আইনি লড়াই করা হবে দেশের দুঁদে আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়েই
এবারের লড়াইয়ে আইনজীবী হিসেবে থাকবেন অভিষেক মনু সিংভি, কপিল সিব্ব্ল, রাকেশ দ্বিবেদী, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্তভূষণ সহ আরো অনেক দুঁদে আইনজীবী রাজ্য সরকারের হয়ে এই যোগ্য চাকরি হারাদের চাকরি পাইয়ে দিতে লড়াই করবেন আদালতে।
এদিনের সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জানিয়ে দেন রাজ্য সরকার কারো চাকরি কেড়ে নেবে না। যে যেরকম ভাবে কাজ করছিলেন সেভাবেই কাজ চালিয়ে যান। মুখ্যমন্ত্রী বলেন “যারা স্কুলে পড়াতেন তারা আজ কি করবেন কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা যারা আজ বিপন্ন তারা কি করবে শিক্ষকবিহীন স্কুলগুলো কাজ কি করে চালাবে? এই বিষয়গুলো সুপ্রিম কোর্টের কাছে জানতে চাওয়া হবে। যারা চাকরি দিতে পারেন না তারা কি করবেন সেটাই জানতে চাইব, তাদের কাছে।”
পাশাপাশি আদালত যদি ফের রাজ্য সরকারের আবেদন ফিরিয়ে দেন সে ক্ষেত্রে যে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এই আশঙ্কা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। সেক্ষেত্রেও মুখ্যমন্ত্রীর বিকল্প ভাবনা “যতক্ষণ পর্যন্ত পুনরায় নিয়োগ না হয় ততক্ষণ চাকরি করা যাবে না। তবে যোগ্যদের কাজ না কেড়ে নিয়ে তাদের কাজ করবার সুযোগ দেবেন শীর্ষ আদালত এটাই আশা করি।”
পরিশেষে মুখ্যমন্ত্রী ফের স্মরণ করিয়ে দেন “যারা যোগ্য তাদের চাকরি নিশ্চিন্ত করার দায়িত্ব সরকারের। যখন কেউ পথ দেখায় পথের মধ্যেই পথ খুঁজে নেয়। পথের মধ্যে গর্ত থাকতে পারে, ভাঙ্গা রাস্তা থাকতে পারে। ভাঙ্গা রাস্তা পেরিয়েই মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়।”
চাকরি হারা শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা “সুপ্রিম কোর্ট আপনাদের চাকরি খেয়ে নিলেও আপনাদের তো স্কুলে যেতে কেউ বারণ করেনি। রাজ্য সরকার তো আপনাদের চাকরি নেই একথা একবারও বলেনি। তাহলে আপনারা স্কুলে যাবেন না কেন। আপনারা শিক্ষক শিক্ষিকা, আপনারা ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াবেন না?”
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সুপ্রিম কোর্ট ঠিক করে দিক কারা যোগ্য আর কারা যোগ্য নয়। সেই তালিকা আমাদের হাতে তুলে দিক সুপ্রিম কোর্ট।
