ভারতের মাটি ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে রপ্তানি পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে নিল দিল্লি। সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সেস এন্ড কাস্টমস (CBIC) ৮ এপ্রিল একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ২০২০ সালের জুন মাসে বাংলাদেশকে দেওয়া এই সুবিধাটি এখন থেকে বাতিল করা হল। তবে, ইতিমধ্যে ভারতে প্রবেশ করা কার্গো আগের নিয়মেই বহন করা যাবে।
ট্রান্সশিপমেন্ট ও ভারতীয় রপ্তানিকারকদের চাপ
তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য রপ্তানিতে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ভারতের একটি শুল্ক স্টেশন ব্যবহার করে অন্য কোনো বন্দর বা বিমানবন্দর ব্যবহার করার সুযোগ পেত বাংলাদেশ। ভারতের পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানিকারক গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্র সরকারের কাছে এই সুবিধা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল। তাদের অভিযোগ বাংলাদেশের রপ্তানি কার্গোর জন্য দেওয়া এই সুবিধার কারণে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বিমান ও বন্দরে জায়গার সংকট তৈরি হয় এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো টার্মিনালে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কয়েকটি ভারতীয় বিমানবন্দর ব্যবহার করা হতো।
ট্রান্সশিপমেন্ট প্রত্যাহার, বাংলাদেশের উপর প্রভাব
ভারতের দেওয়া এই সুবিধায় বাংলাদেশ ভুটান, নেপাল ও মায়ানমারের মতো দেশগুলোতে রপ্তানির কাজ সহজ করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি-আমদানি লজিস্টিকসে বাধার সৃষ্টি হতে পারে, কারণ তাদের তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ভারতীয় পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করতে হত। জিটিআরআই-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেছেন, “এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটিই বাড়তে পারে। এছাড়া, নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলির জন্যও বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।”
ভারতীয় পরিকাঠামো ব্যবহার করে ভুটান, নেপাল ও মায়ানমারের মতো দেশে অন্যান্য পণ্য রপ্তানির প্রক্রিয়াও ব্যাহত হবে এই সিদ্ধান্তের ফলে। ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা এতদিন পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমাতে সাহায্য করেছে।২০২৩-২৪ সালে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২.৯ বিলিয়ন ডলার। এই সিদ্ধান্তের পর দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কী দিকে মোড় নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দুই পড়শির সম্পর্কের প্রভাব
গত দু- দশক ধরে ভারত বাংলাদেশের সব পণ্যকে (মদ ও সিগারেট বাদে) শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়ে আসছিল। গত অগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এই মুহূর্তে অন্তবর্তী সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের (বিশেষত হিন্দুদের) উপর হামলা বেড়ে যাওয়া, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রশাসনের সখ্যতা বেড়ে যাওয়া এবং চিনের সহায়তায় বাংলাদেশের ‘চিকেন্স নেক’ অঞ্চলে কৌশলগত বিমানঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অনেকে।
কিছুদিন আগেই চিনে গিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। দাবি করেছিলেন যে, “ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য, যাদের সেভেন সিস্টার বলা হয়… তারা স্থলবেষ্টিত দেশ, ভারতের স্থলবেষ্টিত অঞ্চল। সমুদ্রে পৌঁছানোর কোনও উপায় তাদের নেই। আমরাই এই অঞ্চলে সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক।… “
ইউনূসের এই মন্তব্যের পরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান ভারতের একাধিক রাজনীতিক।এই মন্তব্য ভারতের কূটনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একে ‘অত্যন্ত আপত্তিকর’ এবং ‘সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কড়া বার্তা দিয়েছিল দিল্লিও। ইউনূসের মন্তব্যের জবাবে, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর বাংলাদেশের সমালোচনা করে জানান যে, “ভারত বিশ্বাস করে যে- সহযোগিতা একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, চেরি-পিকিং বিষয় নয়।” এরপরই বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করার মত সিদ্ধান্ত নিল ভারত।
