মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি মেনে চিনের ওপর ১০৪ শতাংশের শুল্ক আরোপ করে চিয়েছে আমেরিকা।আর তা লাগু হচ্ছে ৯ এপ্রিল, বুধবার থেকেই।হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি এডওয়ার্ড লরেন্স জানান,’চিন তার প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহার না করায় বেজিং-এর উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবে শুরুতে চিন থেকে আমেরিকায় রফতানি হওয়া পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে ছিল আমেরিকা। এরপর ট্রাম্প গত ২ এপ্রিল চিনা পণ্যে আরও ৩৪ শতাংশ শুল্ক চাপান। এর পরেই ফুসে উঠে পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে মার্কিন পণ্যে ৩৪ শতাংশ শুল্ক চাপানোর কথা ঘোষণা করে বেজিং। এতেই বেজায় রেগে গিয়ে চিন শুল্ক প্রত্যাহার না করলে চিনের পণ্যে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে দেন ট্রাম্প। চিন মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়বে এমন ঘোষণা করায় সব মিলিয়ে ১০৪ শতাংশের শুল্ক আরোপ করে দেয় আমেরিকা।
শুল্ক যুদ্ধ মোকাবিলায় ভারতকে বেজিংয়ের বার্তা
শুল্ক যুদ্ধে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি লড়াইয়ে সামিল হতেই ভারতকে পাশে পেতে চাইছে চিন। এই শুল্ক যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে চিন সম্প্রতি দিল্লির উদ্দেশে একাধিক শান্তিপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। সর্বশেষ বার্তাটি এসেছে মঙ্গলবার, দিল্লিতে চিনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, “ভারত ও চিনকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।” ভারতে অবস্থিত চিনা দূতাবাসের মুখপাত্র ইউজিং এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে, আমেরিকার শুল্ক-তোপ মোকাবিলায় ভারত ও চিনকে একযোগে এগোনোর আহ্বান জানিয়ে বার্তা দেন।তিনি সেই পোস্টে লেখেন,’ চিন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক পরিপূরক দিক এবং পারস্পরিক সুবিধার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। মার্কিন শুল্কের অপব্যবহারের মুখোমুখি হয়ে… দুটি বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশের উচিত অসুবিধাগুলি কাটিয়ে ওঠার জন্য একসঙ্গে দাঁড়ানো।’
চিনা দূতাবাসের মুখপাত্র ইউ জিং ‘এক্স’-এ এক দীর্ঘ পোস্টে লেখেন, “চিন-ভারতের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কের অপব্যবহার ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলোকে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে, বিকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের একসঙ্গে দাঁড়ানো উচিত…।” এই পোস্টে ট্রাম্পের উদ্দেশে সতর্ক বার্তাও ছিল—“শুল্ক যুদ্ধের কোনও বিজয়ী নেই। সব দেশেরই উচিত পারস্পরিক পরামর্শ ও প্রকৃত বহুপাক্ষিকতাকে সমর্থন করা এবং একতরফা সিদ্ধান্ত ও সুরক্ষাবাদকে একযোগে প্রতিহত করা।”
ভারতের উপর ট্রাম্পের শুল্ক
চিন বা বেশকিছু দেশের তুলনায় ভারতের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের চাপ এখনও তুলনামূলক কম। ট্রাম্প বহুবার কথা বলার সময় জানিয়েছেন যে, দিল্লি শুল্কের বড় অপব্যবহার করলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে ভারত এখনও কিছুটা রেহাই পাচ্ছে। ভারতের জন্য ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন “ডিসকাউন্টেড” শুল্ক। যদিও তা মাত্র ১ শতাংশ কমে হয়েছে ২৬ শতাংশ। পাশাপাশি এর সঙ্গে নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ বেসিক ট্যারিফ যোগ হবে। এছাড়াও, ওষুধপত্র আমদানির উপর অতিরিক্ত কর আরোপের কথাও ভাবছেন ট্রাম্প।
২০২৪ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে ৮৯.৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, কিন্তু ২০২৫ সালে সামুদ্রিক খাদ্য, যানবাহন ও গাড়ির যন্ত্রাংশের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপে ক্ষতি হতে পারে। তবে চিনের মত আমেরিকার উপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে রপ্তানিতে প্রায় ৫.৭৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।
চিন-ভারত সম্পর্ক, কী করবে দিল্লি?
গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে চিন তার প্রভাব তুলে ধরে বলেছে, “বিশ্বব্যাপী বার্ষিক বৃদ্ধির প্রায় ৩০ শতাংশ আসে চিন থেকে। আমরা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে বাকি বিশ্বের সঙ্গে কাজ করে যাব।” চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-ও কিছুদিন আগে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে বেজিংয়ে বলেছিলেন যে ভারত ও চিনের উচিত একসঙ্গে কাজ করা। চিনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন বার্তা আসাটা গুরুত্বপূর্ণ—যদিও এটা স্পষ্ট যে, এই আহ্বান এসেছে তখনই যখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্কনীতির চাপ থেকে বাঁচার প্রয়োজনে।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে ভারত ও চিনের সম্পর্ক ছিল অবিশ্বাস আর উত্তেজনায় ঘেরা। সেই সময় সীমান্তে সেনা মোতায়েন বেড়েছিল উদ্বেগজনক হারে। অবশেষে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে টহল সংক্রান্ত একটি চুক্তিও হয়েছে দু দেশের মধ্যে। চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের মতে, গত বছর রাশিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে বৈঠকের পর থেকে ভারত এবং চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রগতি হয়েছে। বেজিংয়ের বার্তা দুই দেশ এক হলে আখেরে লাভ দু’জনেরই। চিন প্রশাসনের প্রস্তাব ও উদ্যোগ নিয়ে যদিও এখনও পর্যন্ত ভারত আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।
