আর কিছু না হোক পশ্চিমবঙ্গে ধর্মঘটের ঘট উল্টে গেছে মনে হয়। যা কিছুই হয়ে যাক বনধ ডাকার হিম্মৎ নেই বিরোধীদের কারুর। বনধ এখানে বন্ধ। সে লাল হোক বা গেরুয়া। ভাবুন তো, দিদি মানে আমাদের ঘরের মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী নেত্রী আর কাজ হারানো শিক্ষকদের পিঠে পড়ল লাঠি। আবার লাঠির সঙ্গে লাথি ফ্রি! তাহলে কি অবস্থা হতো একবার ভাবুন তো। গোটা বাংলা স্তব্ধ হয়ে যেত। গোটা বাংলায় তখন হৈ চৈ হুল্লোড় পড়ে যেতো। কী এতো বড় দুর্নীতি। শিক্ষকের চাকরি নিয়ে এই এতো বড় দুর্নীতির সাথে যুক্ত সরকার। তাহলে বন্ধ না ডেকে আর উপায় কী।
সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বামফ্রন্টের মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে বন্ধ ডাকা। সেই পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়া সেই বীর শহীদদের জন্য বন্ধ ডাকা, সেই সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রামের জন্য বন্ধ ডাকা, সেই মহাকরণে মুকবধির ধর্ষিতা মেয়েকে নিয়ে জ্যোতি বসুর কাছে সুবিচার চাইতে গিয়ে বন্ধ ডাকা, সেই নিখোঁজ ভিখারী পাশোয়ান এর জন্য বন্ধ ডাকা। বন্ধ তখন একদম বন্ধুর মতো আমাদের জীবনে ওতপ্রোত ভাবেই জড়িয়ে ছিল যেনো। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পাওয়া যেতো আজ বন্ধ। শুনশান রাস্তা ঘাট। রেল লাইনে ট্রেনের আওয়াজ নেই। কলাপাতা ঝুলছে ভোর থেকেই। কলকাতায় কাজে যাওয়া মফস্বলের লোকজন অফিস যেতে পারছে না। মহানগরের রাস্তায় বাস ট্রাম চলছে না। দিনের শেষে কালীঘাটের বাড়ীতে বসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংবাদিক বৈঠক করে প্রতিক্রিয়া যে বন্ধ সফল। আর শাসক দল বামেদের পাল্টা জবাব কে বলেছে বন্ধ সফল। বন্ধের কোনোও প্রভাব নেই রাজ্যে। এটাই ছিল সেই আমলের চেনা ছবি।
আর আজ চাকরী হারা ২৬ হাজার পরিবার। যোগ্য আর অযোগ্যদের সীমারেখা করে সরকার এর ল্যাজে গোবরে হয়ে যাওয়া। মা মাটি মানুষের সরকার এর মান সম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়া। চাকরী চোর বলে দিকে দিকে স্লোগান ওঠা। জেলায় জেলায় ক্ষোভ বিক্ষোভ বৃদ্ধি পাওয়া। পুলিশ এর হাতে বিক্ষোভ দেখতে লাঠি আর লাথি খাওয়া। সেই ছবি প্রকাশ হলেই চারিদিকে ছি ছি পড়ে যাওয়া। আর নবান্নে বসে সেই ঘটনার জবাব দিতে সাংবাদিক বৈঠক করে প্রশাসনের সাফাই দেওয়া বাধ্য হয়েই পুলিশ মৃদু বল প্রয়োগ করেছে বলে। কিন্তু এত সব কিছুর পরেও কেনো জানি না তেমন জোরদার আন্দোলন শুরু হয়না বিরোধীদের। কিছুটা সেই বামেরা যেনো থমকে গেছে। সেই খাদ্য আন্দোলন, সেই নকশাল আন্দোলন এর সময়ের বামেরা কেমন যেনো বদলে গেছে অনেকটাই। যে দুই আন্দোলনের ফলে সরকার এর বদল হয়েছিল। আর এরপর তো সেই জমি আন্দোলনকে সমর্থন করে তৃণমূলের লালকে হঠিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় আসা।
কিন্তু যখন সেই ক্ষমতায় থাকা মা মাটি মানুষের সরকার এর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ। যে সরকার এর কর্মকাণ্ডে তিতিবিরক্ত আট থেকে আশি সকল শ্রেণীর মানুষজন। রাজনীতির ময়দানে ঘুরে বেড়ানো রাজনীতিক এর মুখে সরকার হঠানোর ডাক। তখন কেন জানি না আমার সেই পুরোনো দিনের বন্ধ ডাকার কথা, সেই রক্ত ঝরা রক্ত গরম করা আন্দোলন এর কথা মনে পড়ে যায়।
সেই শ্রমিক কৃষক খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের একমাত্র পথ সেই বন্ধ, চাক্কা জ্যাম, সেই ফাঁকা মহানগরীর রাস্তা, সেই দুপুর বেলায় ক্রিকেট খেলার মিষ্টি ছবি। সেই বিকেল বেলায় বন্ধ করা রাজনৈতিক দলের হাসি মুখে সাংবাদিক বৈঠক করা। আর বন্ধের বিরোধী শাসক দলের বন্ধ ব্যর্থ বলে জোর গলা তুলে জানান দেওয়া। কোথায় যে হারিয়ে গেলো সেই চেনা ছবি। আজ কেমন করে যেন সব সমঝোতার রাজনীতিতে প্রবেশ করে বন্ধ রাজনীতিটাই কপ্পুরের মতই উবে গেছে। বিরোধী রাজনীতি করা মানুষজন কেমন করে যেনো বদলে গেছে। আলিমুদ্দিনের কর্তারা, আর মুরলিধর লেনের কর্তারা জানেন অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা তাদের রাজনৈতিক জীবন। যে জীবনে বন্ধ, আন্দোলন এইসব অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। এখন সবটাই যে হিসেব করে নিকেশ করে এগিয়ে চলা। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। তাতে লাথি আর লাঠি কোনকিছুই যে তাদের নড়াতে পারে না কিছুতেই।
