মাত্র ২৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এক প্রতিশ্রুতিশীল পাইলট। এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের এই তরুণ পাইলট, যিনি সম্প্রতি বিবাহিতও ছিলেন, নিজের কর্তব্য পালন করতে গিয়েই হঠাৎ করেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারালেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা বিমান পরিবহন শিল্পকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে পাইলট কর্তৃক একটি নির্ধারিত ফ্লাইট অবতরণ করানোর ঠিক পরেই। অবতরণের পর সহকর্মীরা লক্ষ্য করেন, তিনি বিমানের ককপিটেই হঠাৎ বমি করছেন এবং বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করছেন। সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আঁচ করে কো-পাইলট ও অন্যান্য কর্মীরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু চিকিৎসা শুরুর আগেই তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস। সংস্থার মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “আমরা আমাদের পরিবারের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে হারালাম। এই অপূরণীয় ক্ষতির সময়ে আমরা তার পরিবারের পাশে রয়েছি। আমরা সবরকম সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত।” এই দুঃসংবাদে শোকস্তব্ধ তাঁর সহকর্মী ও বন্ধু-বান্ধবরা।
এই ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে ভারতে পাইলটদের কাজের চাপ, দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন কাজের ঘন্টা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবের প্রশ্ন। গত কয়েক বছরে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পাইলটরা কর্মরত অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমনকি প্রাণও হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেশাগত দায়িত্বের চাপ, রাত্রিকালীন ফ্লাইট, অনিয়মিত ঘুম, ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্সের অভাব—এসবই পাইলটদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
এই প্রেক্ষিতেই, দিল্লি হাই কোর্ট সম্প্রতি ডিজিসিএ-কে (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন) নির্দেশ দিয়েছে পাইলটদের সাপ্তাহিক বিশ্রামের সময় বাড়াতে। বর্তমানে পাইলটদের সাপ্তাহিক বিশ্রামের সময় ৩৬ ঘণ্টা, যা ১ জুলাই থেকে ৪৮ ঘণ্টা করা হবে বলে জানা গেছে। এই নতুন নীতির লক্ষ্য হল, পাইলটদের স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং এমন দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনা কমানো।
ভারতীয় বিমান পরিবহন ক্ষেত্র বর্তমানে ব্যাপক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে পাইলটদের উপর দায়িত্বও। অথচ অনেক সময় সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের শরীর ও মনে যে চাপ পড়ে, তা অবহেলিত থাকে। সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি, শারীরিক পরীক্ষার কঠোরতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য পর্যালোচনার প্রক্রিয়া আরও জোরদার করার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
এই তরুণ পাইলটের অকালমৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি গোটা বিমান চলাচল ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। প্রতিটি যাত্রীর জীবনের নিরাপত্তা যেমন পাইলটের উপর নির্ভর করে, তেমনই একজন পাইলটের জীবন ও সুস্থতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, নিরাপদ আকাশপথ নিশ্চিত করতে হলে, আকাশের অধিনায়কদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
পরিবার, সহকর্মী এবং গোটা বিমান সংস্থা আজ শোকাহত। কিন্তু এই শোকই যেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার আলো হয়ে ওঠে—এটাই এখন সকলের কামনা। এই মৃত্যু যেন নিছক এক শোকবার্তা হয়ে না থাকে, বরং পাইলটদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে এক নতুন দিশা দেখাক, এটাই প্রত্যাশা।
