সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
আমেরিকা সফরে গিয়ে বস্টনে দেশের নির্বাচন পদ্ধতি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে রাহুল গান্ধীর সমালোচনার কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল নির্বাচন কমিশন। “জনাদেশ বিপক্ষে যাওয়ার পর নির্বাচন কমিশনকে হেয় করা বা কমিশনের নিন্দা করা বা মিথ্যে অভিযোগ তোলা শুধু অর্থহীন নয় এটা অযৌক্তিক।” জানিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
প্রাক্তন জাতীয় কংগ্রেস সভাপতি তথা বর্তমান রায়বেরেলির কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধীর সমালোচনার প্রেক্ষিতে কমিশনের স্পষ্ট বিবৃতি “দেশজুড়ে সমস্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া দেশের সংবিধান ও নির্বাচনী বিধি মেনেই সম্পন্ন হয়। ভারতীয় নির্বাচনের এই ত্রুটিহীন পদ্ধতি গোটা বিশ্বে সমাদৃত। তা সত্ত্বেও যদি বিশ্বের দরবারে ভারতীয় নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কোন ভুল তথ্য ছড়ানো হয় তাহলে তা শুধু ভারতীয় নির্বাচনী বিধি বা সংবিধানকেই অবমাননা করে না পাশাপাশি নিজস্ব রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার প্রতিনিধির সম্মানহানি হয় এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত লাখো নির্বাচনী কর্মীর মনোবলে আঘাত করে।” রাহুল গান্ধীর সমালোচনা প্রেক্ষিতে কমিশনের এই প্রতিক্রিয়া
দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের মত একটি সাংবিধানিক সংস্থার এহেন কড়া প্রতিক্রিয়া সাম্প্রতিককালে নজিরবিহীন বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
উল্লেখযোগ্য, গতবছর লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও দেশের নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছে জাতীয় কংগ্রেস। গত ২৪ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জাতীয় কংগ্রেসের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে যুক্তিসহ প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে তা এখনো লিপিবদ্ধ রয়েছে। এরপরও কংগ্রেস ও নির্বাচন কমিশনের দ্বৈরথ থেমে থাকেনি। কিছুদিন আগে মহারাষ্ট্র ও দিল্লির বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে ফের জলঘোলা শুরু হয়। বিশেষ করে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে সমালোচনার ঝড় তোলা হয় এআইসিসি বা কংগ্রেস হাইকমান্ডের পক্ষ থেকেও। যুক্তি পাল্টা যুক্তি, শাসকবিরোধী তরজা এই সব কিছুর মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক দানা বাধে বিদেশের মাটিতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে রাহুল গান্ধীর সমালোচনার ঝড়। রাহুলের মূল ইঙ্গিত যখন নির্বাচন কমিশনের দিকে তখন পাল্টা তোপ দেগেছে নির্বাচন কমিশনও। কমিশনের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে , দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকেন সরকারি কর্মীরা। একই সঙ্গে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ভোটের বুথ থেকে বিভিন্ন সংসদীয় ক্ষেত্র বা বিধানসভা ক্ষেত্রে যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও। সব ক্ষেত্রেই প্রার্থীর মনোনীত প্রতিনিধি এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকেন। অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের মতই মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে। মহারাষ্ট্রে ৬ কোটি ৪০ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫৮৮ ভোটার ভোট দিয়েছেন যেখানে প্রতি ঘন্টায় গড়ে ৫৮ লাখ ভোটদান হয়েছে। শুধুমাত্র শেষ দু’ঘণ্টায় এক কোটি ১৬ লক্ষ ভোটার ভোট দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই তথ্যের ভিত্তিতে রাহুল গান্ধীর তোলা শেষ দু’ঘন্টায় ভোটদানের হার নিয়ে অভিযোগ মানতে নারাজ নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি, মহারাষ্ট্রের প্রতিটি ভোটের বুথে জাতীয় কংগ্রেসের মনোনীত প্রতিনিধিরা ছিলেন যারা ভোট প্রক্রিয়া নিয়ে কোন অভিযোগ তোলেননি। এমনকি ভোটের পরের দিন রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রোটিনের সময় বা নির্বাচনী পর্যবেক্ষক এর কাছেও কোন অভিযোগ করা হয়নি কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে। ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেকশন রুল অনুযায়ী মহারাষ্ট্র সহ গোটা দেশেই ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। যেকোনো নির্বাচনের আগেই ভোটার তালিকার সংক্ষিপ্ত সংশোধনী হয় এবং সমস্ত জাতীয় ও রাজ্যস্তরের দলগুলির কাছে তার খসড়া তুলে দেওয়া হয়। মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ৯ কোটি ৭৭ লক্ষ ৯০ হাজার ৭৫২ ভোটারের তালিকা জাতীয় কংগ্রেস সহ সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছেই তুলে দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা জেলা শাসকদের কাছে প্রথম লেবেলে ৮৯ টি এবং রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এর কাছে দ্বিতীয় লেভেলে মাত্র একটি অভিযোগ জমা পড়ে। নির্বাচন কমিশনের দাবি, এই তথ্যই স্পষ্ট করে দেয় যে মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার তালিকা নিয়ে জাতীয় কংগ্রেসসহ কোনো রাজনৈতিক দলেরই সেভাবে কোন অভিযোগ ছিল না। রাহুল গান্ধী মহারাষ্ট্রের ভোটার তালিকা নিয়ে যে অভিযোগ তুলেছেন তাকে যুক্তি সঙ্গত বলে মনে করতে নারাজ কমিশন। ” ১ লাখ ৪২৭ ভোটের বুথে ৯৭ হাজার ৩২৫ বুথ লেভেল অফিসার, ১ লাখ ৩ হাজার ৭২৭ বুথ লেভেল এজেন্ট ( যারা রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং এর মধ্যে জাতীয় কংগ্রেসের এজেন্ট সংখ্যা ২৭ হাজার ৯৯) ছিলেন যেখানে ভোটার তালিকা নিয়ে কোনও প্রশ্নই তোলা হয়নি। ফলে ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে ভোটের পরে জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা তোলা অভিযোগ সম্পূর্ণ অনৈতিক ও আইনবিরুদ্ধ।”
