২৩৫ বছরে হয়নি নতুন সমাধি, তবু ঐতিহ্যের ক্যানভাসে উজ্জ্বল কলকাতায় ডিরোজিও-জোন্সদের সমাধিক্ষেত্র
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
গত ২৩৫ বছরে নতুন করে কোন দেহ সমাধিস্থ হয়নি। তাতে কি? আজও নিজস্ব গরিমায় উজ্জ্বল কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ২৬৮ বছরের প্রাচীন সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রি। বলা হয়, উনিশ শতকে আমেরিকা ও ইউরোপের বাইরে এটাই ছিল সম্ভবত সবথেকে বড় খ্রিস্টান সমাধিক্ষেত্র। প্রাচীন কলকাতার অন্যতম আইকন এই সমাধিস্থল বা সিমেট্রিতেই শায়িতশিক্ষক-কবি এবং সমাজ সংস্কারক তথা বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্স, সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার এলাইজা ইম্পে, হিন্দু স্টুয়ার্ড নামে পরিচিত মেজর জেনারেল চার্লস স্টুয়ার্ট এরকম আরও অনেকেই। এই ঐতিহাসিক সমধিক্ষেত্রে প্রথম দেখা সমাধি দেওয়া নিয়ে মতান্তর রয়েছে। একাংশের মতে, কাস্টমস হাউসের লেখক জন উড প্রথম সমাধিস্থ হন।
১৭৬৭ সালের ২৫ আগস্ট কাস্টমস হাউজের জন উডকে কবর দেওয়া হয়। প্রবেশপথটিও তার নামেই তৈরি করা হয়েছে। যদিও অনেকের মতে, প্রথম এখানে যাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল তিনি হলেন এস পিয়ারসন। এছাড়া ৩৬৩ নম্বর কবরে শায়িত ব্যক্তির কোন নাম নেই..অনামী এই সমাধিস্থলে লেখা রয়েছে ‘আ ভার্চুয়াল মাদার’। এখানে একটা সমাধিক্ষেত্র রয়েছে যা হিন্দু মন্দিরের আদলে তৈরি। ১৭৬৭ সালে এই কবর খানা স্থাপিত হয়েছিল। ১৭৯০ সাল পর্যন্ত এখানে কবর দেওয়ার কাজ হতো।
১৯৮৪ সালে এই সমাধিক্ষেত্রটি ভেঙেচুরে একটা দৃষ্টিনন্দন জায়গায় পরিণত করার চেষ্টা করে এক ব্যবসায়ী পরিবার। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ক্ষেত্রের চরিত্র বদল নিয়ে শহর কলকাতায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে এই ঐতিহাসিক ক্ষেত্রের চরিত্র পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। আজও সমান মর্যাদায় ও স্বমহিমায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে ডিরোজিও-জোন্স-ইম্পে দের বুকে ধারণ করে রয়েছে সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রি।
একদা পার্কস্ট্রিট ছিল
কবরখানায় যাওয়ার রাস্তা। গা ছমছমে পরিবেশ। তৎকালীন সময়ে অনেকেই এখানে আসতে ভয় পেতেন। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর কলকাতা পুরোপুরি ব্রিটিশদের দখলে আসার পর নিত্যনৈমিত্তিক সমস্ত সুযোগ-সুবিধাগুলোর প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কেউ মারা গেলে তাকে কবর দেওয়ার বিষয়টাও তাদের মাথায় ছিল। সেন্ট জোন্স গির্জা যেখানে এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই জমিতেই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীন ব্রিটিশ সমাধিস্থল। এখানেই জোব চার্নকের সমাধি রয়েছে। কিন্তু সেই সমাধিস্থল ধীরে ধীরে ভরে ওঠে। এরপর ১৭৬৭ সালে নতুন করে সমাধিক্ষেত্র তৈরির কাজ শুরু হয় তৎকালীন মরাঠা খালের কাছে। যেহেতু কবর লাগোয়া রাস্তা তাই নাম হয় বেড়িয়াল গ্রাউন্ড রোড। (বর্তমান পার্ক স্ট্রিটের প্রাচীন নাম) স্থানীয় নাম অবশ্য ছিল বাদামতলা। এই অঞ্চলে অসংখ্য বাদামগাছ ছিল। সেই জন্য নাম হয় বাদামতলা। গোটা অঞ্চলটা বেশ খানিকটা ঘন জঙ্গলে ভরা ছিল। ডাকাতদের বাস ছিল বলেও জানা গেছে।
ইশ্বর বাইরে থাকা বা নন চার্জ সিমেট্রির মধ্যে সাউথ পার্কস্টিট কবরস্থান বা সমাধিক্ষেত্র অন্যতম। ক্রমে এর জায়গাও ফুরিয়ে আসে। তথ্য বলছে, ১৭৯০ সালের পর এই সিমেট্রিতে আর কোনও সমাধি দেওয়া হয়নি। তবে ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে আজও সমুজ্জ্বল পার্ক স্ট্রিটের এই ঐতিহাসিক ক্ষেত্র।
