দীঘার বুকে এক নতুন ইতিহাস রচনার পথে। আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা, তারপরই নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরে দেবদেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সূচিত হবে এক নতুন যুগ। গোটা শহর ইতিমধ্যেই সেজে উঠেছে উৎসবের আবহে। আগামী ৩০ এপ্রিল, অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যতিথিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হবে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন।
প্রাণপ্রতিষ্ঠার আগে চলছে একাধারে আচার-অনুষ্ঠান ও ব্যাপক যজ্ঞ। শুক্রবার অস্থায়ী আটচালা ঘরে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ স্নানযজ্ঞ। ১২ লিটার পবিত্র দুধ দিয়ে স্নান করানো হয় জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শন দেবতাকে। একইসঙ্গে বিমলা, লক্ষ্মী, সত্যভামা-সহ অন্যান্য দেব-দেবীদেরও স্নান সম্পন্ন করা হয়েছে।
মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে বিশেষ হোমযজ্ঞ। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রাজেশ দৈতাপতির নেতৃত্বে আয়োজন করা হয়েছে চারটি কোণের হোমকুণ্ড এবং কেন্দ্রে এক বিশাল মহাকুণ্ড। পবিত্র অগ্নিতে আহুতি দিয়ে দেবতাদের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই হোমযজ্ঞ চলবে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত, প্রতিদিন নির্দিষ্ট বিধি মেনে। বিশেষ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন ২৫ জন মহিলা, যাঁরা কলস নিয়ে গর্ভগৃহ প্রদক্ষিণ করেছেন।
জেলা প্রশাসনও প্রস্তুতি সুনিশ্চিত করতে মরিয়া। জেলা শাসক পূর্ণেন্দু মাজি নিজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির তত্ত্বাবধান করছেন। মুখ্যমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ২৮ এপ্রিলের মধ্যেই দিঘা শহর সাজিয়ে তোলা হয়েছে সুদৃশ্য আলোকসজ্জায়। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী, যাতে মেগা ইভেন্ট নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
নবনির্মিত দীঘার জগন্নাথ মন্দির পুরীর মন্দিরের আদলে নির্মিত। ‘সম্পরা’ ঘরানার কলিঙ্গ স্থাপত্য অনুসরণ করে রাজস্থানের গোলাপি বেলেপাথর দিয়ে গড়ে ওঠা এই মন্দির তৈরিতে কাজ করেছেন প্রায় ৮০০ জন কারিগর। মন্দিরের প্রবেশপথে নির্মিত তিনটি দীপস্তম্ভ, সিংহদ্বার সামনে ৩৪ ফুট উঁচু কালো পাথরের ১৮ মুখী অরুণা স্তম্ভ—সব কিছুতেই পুরীর প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ে।
মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলেই প্রথমে রয়েছে ভোগমণ্ডপ, এরপর নাটমন্দির, তারপর জগমোহন এবং সবশেষে গর্ভগৃহ। গর্ভগৃহের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হবেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। গরুড় স্তম্ভের উপস্থিতি এবং নাটমন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা দশাবতার ও অপরিমেয় কারুকার্য মন্দিরটিকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। এছাড়া নিয়ম করে মন্দিরের চূড়ায় প্রতিদিন ধ্বজা পরিবর্তন করা হবে, পুরীর রীতি অনুসরণ করে।
দীঘার এই জগন্নাথ মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থা নয়, এক নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার পথে। আর প্রাণপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই নব অধ্যায়ের সূচনা হবে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে, চিরস্থায়ী আশীর্বাদের প্রত্যয়ে।
