সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
হাজার আইন-কানুন, প্রশাসনিক হুঁশিয়ারি ও গাল ভরা আশ্বাস সত্ত্বেও সর্বগ্রাসী আগুনে নিরীহ প্রাণের বলির শোভাযাত্রার ছবিটা বদলানো যায়নি। সরকারি আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আধিকারিকদের দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে বেআইনিভাবে ব্যবসায়িক কাজকর্ম চালাতে গিয়ে একের পর এক দুর্ঘটনায় আগুনের গ্রাসে বলি হচ্ছে নিরীহ প্রাণ। যার নবতম সংযোজন হলেও কলকাতার মেছুয়া পট্টির কাছে মঙ্গলবার রাতে একটি বেসরকারি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের বলি হওয়া দুটি শিশু সহ তরতাজা ১৪ টি প্রাণ। তথ্য ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে গত চার দশকে শহর কলকাতা যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডগুলোর সাক্ষী থেকেছে সেই তালিকায় ঢুকে পড়েছে মেছুয়ার এই বেসরকারি হোটেলের অগ্নিকাণ্ড।
প্রায় ৪০ বছর আগে ১৯৮৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে আগুনের গ্লাসে পড়েছিল কলকাতার নিউ মার্কেট। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে সেনাবাহিনী এসে আগুন নেভানোর কাজে হাত লাগিয়েছিল। বেশ কয়েক ঘন্টার চেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। গভীর রাতে আগুন লাগায় প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ভষ্মিভূত হয়েছিল ব্যবসায়ীদের প্রচুর সরঞ্জাম। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের কান্না আজও কলকাতাবাসীর মনে হয়তো রয়ে গিয়েছে। শুধু নিউ মার্কেট নয় এভাবেই আগুনের গ্লাসে বলি হয়েছে কলকাতার একের পর এক বড় বড় মার্কেট। ক্যামাক স্ট্রিটের বরদান মার্কেট, ফিরপো মার্কেট, ব্রাবোর্ন রোডের চুড়িবাজারের অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি আজও কলকাতা বাসী ভোলেনি।
১৯৯১ সালে এসএন ব্যানার্জী রোডে বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডের আগুনের স্মৃতিও ভয়াবহ। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল ফটোগ্রাফির আর্কাইভ। সর্বগ্রাসী আগুনে সবকিছু হারিয়েও ফের মাথা তুলে দাঁড়ালেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সেই ক্ষতির ধাক্কায় ২০১৬ সালের জুন মাসে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ১৭৬ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সংস্থা বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড।
ফিরপো মার্কেটে আগুন লেগেছিল ২০০২-এর ২৩ এপ্রিল মধ্যরাতে। আগুন নেভাতে দমকলের ৪০টি ইঞ্জিন গিয়েছিল ঘটনাস্থলে। পরদিন সকালে আগুনের এই সর্বনাশী তাণ্ডব দেখে শিউরে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষজনও।
২০০৮ সালে নন্দরাম মার্কেটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা কে ভুলবে? কলকাতার বড় বাজারের ঘিঞ্জি এলাকায় নন্দরাম মার্কেট। দোকানে তো বটেই, সিঁড়ি বা ঘরের সামনে যেখানে যেটুকু জায়গা, তাতেই ঠেসে সাজানো বিক্রির জিনিসপত্র। গোটা বাড়িতে তারের জঙ্গল। দুদিন ধরে সেই আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল দমকল বাহিনীকে। নন্দরাম মার্কেটের বেআইনি বা অবৈধভাবে ব্যবসা করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিস্তার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছিল প্রশাসনিক হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফের ২০১৯-এর ১৪ সেপ্টেম্বর আগুনের কবলে পড়েছিল নন্দরাম মার্কেট। সেদিনও ভুল থেকে শিক্ষা নেয়নি নন্দরাম। ২০০৮ সালের নন্দরাম মার্কেটের আগুন এর ঘটনার পরই কলকাতা শহরের স্কাই লিফটের প্রয়োজনীয়তার কথা অনুভব করে কলকাতা পুরসভা তথা তৎকালীন রাজ্য সরকার। তারপরও বেশ কয়েক বছর কেটে যা গেলে শহরে আসে আধুনিক স্কাই লিফট সহ আরও কত কি। আর প্রশাসনিক দায়িত্ব বা তৎপরতা? তা ছিল যেটি মেরে রয়ে যায় সেই তিমিরেই।
২০১০-এর ২৯ মার্চ পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্টের আগুন ছিল রীতিমত ভয়াবহ। আগুনের বলি হন ৪২ জন। টিফিন কোর্টের হেরিটেজ বাড়ি থেকে রাস্তায় লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু হয় বেশ কয়েকজনের। পার্ক স্ট্রিটের মত এলিট এলাকায় টিফিন কোর্টের বাসিন্দাদের প্রাণ বাঁচানোর আকুতি দেখে আঁতকে উঠেছিল রাজ্যবাসী। আগুনের লেলিহান শিখা বস্তির বেড়ার ঘর বাস টিফিন কোর্টের মত ঐতিহ্যবাহী এলিট ক্লাসের ভবনের যেকোনো বাদ বিচার করে না তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিল সেদিনের অগ্নিকাণ্ড।
২০১১-র ১২ সেপ্টেম্বর। দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া আমরি হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ড শহর কলকাতার সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়। মৃতের সংখ্যা ৯৮। গোটা দেশে আলোড়ন জাগানো অগ্নিকাণ্ডের তালিকায় ঢুকে পড়েছে আমরি অগ্নিকাণ্ড। রাজ্যে তখন পালাবদলের নতুন সরকার। গোটা আমরি হাসপাতাল কার্যত গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছিল। এক কথায় অশক্ত শরীরে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দমবন্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুকে অসহায়ভাবে বরণ করেছিলেন এই অগ্নিকাণ্ডের মৃতরা। আমরি অগ্নিকাণ্ডের দিনে পুলিশ ও দমকলের সঙ্গে লাগোয়া বস্তির প্রান্তিক মানুষগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেভাবে উদ্ধারকার্যে সাহায্য করেছিলেন তারা অবশ্যই মনে রেখেছে কলকাতা। আর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঠায় এসএসকেএম হাসপাতালে উপস্থিত থেকে মর্গের যাবতীয় কাজের তদারকি করে দিনে দিনে 98 জন মৃত ব্যক্তির পরিবারের হাতে ডেট সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া থেকে এবং অন্তিম সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গোটা দেশে নজির সৃষ্টি করেছিলেন পালাবদলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমরি অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি কথা কিন্তু কলকাতার বুকে আজও দগদগে।
২০১৩-র ২৭ ফেব্রুয়ারি বড় আগুন লাগে সূর্য সেন স্ট্রিটে। মৃত্যু হয়েছিল মোট ১৯ জনের। সেখানেও অগ্নিবিধি কে অমান্য করার অভিযোগে সড়ক হয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০১৮-র ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে আগুন লাগে দাহ্য পদার্থে ঠাসা বাগরি মার্কেটে। গোটা মার্কেট ছাই করে দেয় আগুনের লেলিহান শিখা। অসম লড়াইয়ে কার্যত হার মানতে হয় দমকলকর্মীদের। এক এক করে ছ’তলা আগুনে ছাই হয়ে যায়। বাগরি মার্কেটের বিধ্বংসী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে চার দিন সময় লেগেছিল দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং পুলিশের।
নন্দরাম মার্কেটের আগুনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা বাগরি মার্কেটের অগ্নিবিধি নিয়ে তারপর অনেক সরল হলেও বাস্তবে তা কতটা রূপায়িত হয়েছে সেই প্রশ্ন কিন্তু আজও রয়ে গেছে!
২০২১-এর ৮ মার্চ সন্ধ্যায় আগুন লাগে স্ট্র্যান্ড রোডে নিউ কয়লাঘাটা বিল্ডিংয়ের ১৪ তলায়। অগ্নিদগ্ধ ও দমবন্ধ হয়ে এবং প্রাণ বাঁচাতে উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু হয় মোট ৯ জনের।
এরপর সর্বশেষ অনুযায়ী এই তালিকায় নতুন নাম লেখালো কলকাতার মিচুয়া বাজার সংলগ্ন এই বেসরকারি হোটেলের অগ্নিকাণ্ড। যেখানে অসহায় ভাবে নিজেদের আগুনের গ্রাসে সমর্পণ করতে হয় দুই শিশুসহ ১৪ জনকে।
কলকাতা শহরের অগ্নিকাণ্ডের গত চার দশকের ইতিহাস ঘাটলেই বোঝা যায় যে সর্বগ্রাসী আগুনের ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়। এর নেপথ্যে আছি আইন ভাঙার খেলা এবং দুর্নীতির দৌরাত্ম। একগুচ্ছ সরকারি নিয়ম-কানুন নিত্য নতুন অগ্নি নির্বাপক পরিকাঠামো নিয়ম করে প্রশাসনিক আশ্বাস অথবা হুঁশিয়ারি সব কিছুই রয়েছে কিন্তু নেই শুধু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের তাগিদ। বিপদ সর্বগ্রাসী জেনেও বাড়তি মুনাফার লোভে ব্যবসায়িকরা যেমন লোভের ফাঁদে পা দিয়ে সাধারণ নিরীহ মানুষের বিপদ ডেকে আনেন ঠিক তেমনি প্রশাসনিক আধিকারিক বা কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের দায়িত্ব সম্বন্ধে এতটাই উদাসীন অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত যে মানুষের জীবনের দাম তাদের কাছে নিতান্তই নগণ্য। তারই পরিণতি মঙ্গলবার রাতের এই তরতাজা চৌদ্দটি প্রাণ। হয়তো ভবিষ্যতে এই তালিকা আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে তবে লোভ ও দুর্নীতির কারবারিদের হুঁশ ফিরবে কি?
