ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে পরিস্থিতি আবারও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে পাকিস্তান সেনার লাগাতার গুলিবর্ষণ আর তার পাল্টা জবাবে ভারতীয় সেনার কড়া অবস্থান ফের একবার দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে টান টান করে তুলেছে। এই উত্তেজনার সূচনা হয়েছে রাজস্থানের সীমান্ত অঞ্চল থেকে, যেখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এক পাকিস্তানি রেঞ্জারকে আটক করেছে। এই রেঞ্জার ভারতীয় ভূখণ্ডে জেনেবুঝেই প্রবেশ করেছিল বলে বিএসএফ সূত্রে খবর। এমন অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—পাকিস্তান কি পরিকল্পিতভাবেই এই অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছিল? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনও সামরিক বা গোয়েন্দা উদ্দেশ্য?
যাই হোক, ওই রেঞ্জারকে আটক করার পর থেকেই সীমান্তে আচমকাই বেড়ে যায় পাকিস্তান সেনার তৎপরতা। রাতের অন্ধকারে শুরু হয় গোলাগুলি। ভারতের কুপওয়াড়া, বারামুল্লা, পুঞ্চ, রাজৌরি, মেন্ধর, নৌসেরা, সুন্দেরবানি ও আখনুর সেক্টরে টানা দশদিন ধরে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। এমনকি শনিবার রাতেও একাধিক পোস্ট থেকে ভারতীয় অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। বিএসএফ এবং ভারতীয় সেনা যৌথভাবে পাল্টা জবাব দিলেও পরিস্থিতি যে কতটা বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিনের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই।
এই উত্তেজনার মধ্যে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘিরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিএসএফের জওয়ান পূর্ণম কুমার সাহু ২৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের ফিরোজপুর সেক্টরে সীমান্তের কাছাকাছি কৃষকদের জমি পাহারায় ছিলেন। সেই সময় অসাবধানতাবশত তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে ঢুকে পড়েন। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ভুল করে পার হওয়া কোনও সেনা বা নাগরিককে অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা, কিন্তু পাকিস্তান এখনও তাঁকে মুক্ত করেনি। একদিকে তারা সীমান্তে আগ্রাসন চালাচ্ছে, অন্যদিকে ভারতের একজন জওয়ানকে আটকে রেখে মানবিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ভারতের তরফে বারবার কূটনৈতিক যোগাযোগ করা হলেও পাকিস্তানের দিক থেকে কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি নিছক সীমান্ত বিরোধের চেয়েও বড় কিছু নির্দেশ করছে। পাকিস্তান এই মুহূর্তে চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলিকে চাপা দেওয়ার জন্য প্রায়শই তারা সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করে থাকে, যেন জাতীয়তাবাদের আড়ালে জনগণের দৃষ্টি সরানো যায়। এছাড়াও কাশ্মীরে অশান্তি বজায় রাখতে পাকিস্তানের পুরোনো অভ্যাস এখনও অক্ষত আছে। বিশেষ করে যখন ভারতে কোনও বড় রাজনৈতিক পর্ব বা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তখন পাকিস্তান এমন সংঘর্ষবিরতির লঙ্ঘন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে চায়।
তবে ভারতের প্রতিক্রিয়া এই মুহূর্তে অত্যন্ত পরিমিত ও কৌশলগত। সীমান্তে কড়া নজরদারি, দ্রুত পাল্টা জবাব এবং আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের আগ্রাসনের তথ্য তুলে ধরার প্রচেষ্টা একসঙ্গে চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। সরকার ও সেনাবাহিনী দু’পক্ষই বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। এমনকি জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চেও এই ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হতে পারে।
এই মুহূর্তে ভারতের সামনে এক কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষার সময়। একদিকে সীমান্তে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে বিএসএফ জওয়ান পূর্ণম কুমার সাহুকে দ্রুত ফেরত আনার জন্য কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখতে হবে। সীমান্তে যে আগুন জ্বলছে, তা শুধু দুটো দেশের দ্বন্দ্ব নয়, বরং একটি বড় আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। পাকিস্তান যতই উসকানি দিক না কেন, ভারতের উচিত হবে শান্তি ও সংহতির পথে থেকেই নিজেদের স্বার্থ ও সম্মান রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়া।
