অভিজিৎ বসু
মাঝে-মাঝে মনে হয়, যুদ্ধ হলেই ভালো হয় বেশ। যুদ্ধটা যদি সত্যিই বেঁধে যায় তাহলে আর মন্দ কী। বেশ দেশ জুড়ে যুদ্ধ যুদ্ধ বারুদের গন্ধ নাকে লাগবে। এদিকে ওদিকে ফিসফিস, গুজগুজ আওয়াজ শুরু হবে। হাল্লা রাজার মতো দিনভর চেঁচিয়ে উঠি আমরা, যুদ্ধ আর যুদ্ধ বলে। সত্যিই সেই ঘুম ভেঙে উঠে যুদ্ধ। সেই ঘুমোতে যাওয়ার সময় যুদ্ধ। শুধুই সেই কানে বাজছে যুদ্ধের দামামা আর রণডঙ্কা। কিন্তু কার সঙ্গে যুদ্ধ? পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ? হিন্দুর সাথে মুসলমানের যুদ্ধ? রাজার সাথে ফকিরের যুদ্ধ? এক অখণ্ড দেশকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে সেই ভাঙা পড়শী দেশের মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ?
রোজ যুদ্ধের জিগির। আবার সেই গলা তাক করা আঁশবঁটি এগিয়ে আসছে, যুদ্ধ একটা যেনো বাধবেই।
কিন্তু আমাদের তো কত যুদ্ধ ছিল। কী মিষ্টি সব যুদ্ধ! বাঁশের ধনুক, পাটকাঠির তির, সেই গুলতি হাতে চোখ পাকিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া। আমার বন্ধুর ছোড়া তির আমার বুকে এসে লাগল। আমি দূর আকাশের বলাকার মতো তিরবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ খুলে তাকাতাম না। মিনিট খানেক পরে বন্ধু বলত, ‘কী রে ওঠ, আর কতক্ষণ মরে পরে থাকবি। ভাল্লাগে না।’ যুদ্ধ শেষে সাদা গেঞ্জি উড়িয়ে বলতাম, শান্তি শান্তি। পাশের বাড়ির সাদা পায়রা উড়ে যেত। আকাশে বিস্তর ফস্টিনস্টি করে সে লটকে আনতে আর একটা পায়রা। লটকে আনত মানে ফুঁসলে আনত। নীল আকাশে পায়রার ছলাকলা, সোহাগ, ইশারা…কত যে যুদ্ধ ছিল সেই নীল আকাশে সেই ছোটো বেলায় আমাদের। সেই সব আমের মুকুলের গন্ধমাখা উতল যুদ্ধ যে কোথায় হারিয়ে গেল কে জানে!
আসলে এই সব ছোটবেলার কচি আমের বউলের গন্ধ মাখা মিস্টি যুদ্ধের সাক্ষী ছিল আমাদের শৈশব। যে যুদ্ধ আমাদের সবার প্রিয় ছিল সেই সময়ে। কিন্তু আজ যেন সত্যিই সেই ছোটবেলার যুদ্ধ কোথায় যে হারিয়ে গেলো কে জানে। আসলে এখন যে দিন বদলে গেছে অনেক। হারিয়ে ফেলেছি আমাদের সেই তির মাখা যুদ্ধের খেলা আকাশপানে এখন শুধুই অন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি আর হিসেব কষা। তাল ঠুকছে এক দেশ অন্য দেশকে হুমকি দিচ্ছে। আর তার মাঝে মনের মাঝে সেই বিখ্যাত গান, যখন তুমি আমায় পাগল বলো, ধন্য যে হয় সে পাগলামি ….
সত্যিই সেই শৈশব কেটে কৈশোর, কাঁচা বয়সের পাগলামি। ভালোবাসার বান ডাকা আমুদে জীবন। যে জীবনেও যুদ্ধ ছিল সেই গভীর গোপন ভালোবাসার মানুষের কঠিন মনকে জেতার একটা যুদ্ধ। যে যুদ্ধ নিয়ে ভয় আতংক গ্রাস করেনি কখনও কোনোও সময়। যে যুদ্ধে হার বা জিত যাই হোক এমন করে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু হয়নি। তাল ঠুকে বলতে হয়নি যে যুদ্ধ আমাদের সবার প্রিয়। সেই আমলে হেমন্ত আর মান্নার যুদ্ধ ছিল। সেই দাদরা না কাহারবা সেটা নিয়ে যুদ্ধ ছিল। সেই মোহনবাগানি বন্ধুর সাথে ইস্টবেঙ্গল এর যুদ্ধ ছিল। কিন্তু এই সব যুদ্ধের মাঝে ভেতো বাঙালি সেই অম্বল আর বুক জ্বালাকে সঙ্গে করে কবে আর যুদ্ধের জন্য কামান ধরেছে?
তবু যুদ্ধ নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাস্তায় কত আলোচনা। ট্রেনে,বাসে কোলকাতায় ট্রাম তো নেই প্রায় সব জায়গায় যুদ্ধের আলোচনা। কত গোল দেওয়া যায় তার হিসাব কষা। এই পক্ষের সমরাস্ত্র আর ওই পক্ষের কত তার পাল্টা আছে সেটাই দেখার বিষয় ঠিক যেনো মোহনবাগানের সুব্রত আর ইস্টবেঙ্গলের মনোরঞ্জন এর বল নিয়ে যুদ্ধ। ঠিক যেনো সেই সুনীল গাভাস্কার আর ডেনিস লিলির ব্যাট আর বলের যুদ্ধ। সেই পুরোনো দিনের পুরোনো আমলের মিষ্টি মধুর যুদ্ধ প্রাণঘাতী যুদ্ধ নয়।
আসলে আমরা বোধহয় সত্যিই খুব ভীরু তাই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা বলে উত্তেজিত হলেও সত্যি যুদ্ধ নিয়ে বেশ একটু ভয়েই থাকি। ঘরে যুদ্ধ, অফিস কাছারিতে যুদ্ধ, নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ, মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার যুদ্ধ। সারাটা জীবন ভোর যুদ্ধ। তার মাঝে আবার একটা নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে কি যে হবে কে জানে। আর সত্যিই যুদ্ধ শুরু হলে কি করতে হবে তার জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে এর মধ্যে কেন্দ্র সরকার। চারিদিকে মক ড্রিলের আয়োজন আর প্রস্তুতি।
এই সবের মাঝেই কেমন বাতাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগমনী বার্তা। শিউলি ফুলের সময় নয় এখন বেল আর জুঁই এর ম ম গন্ধ। তবু এইসবের মাঝে পড়শী দেশের মানুষকে শিক্ষা দিতেই কত কিছুই না হচ্ছে। সেই বিপরীত মেরুর দুই রাজনীতির দল এই বিষয়ে একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে বলছে এই ইস্যুতে কোনোও রকম রাজনীতি নয়। দেশের স্বার্থ রক্ষা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। কংগ্রেস আর তৃণমূল কংগ্রেসকে পাশে পেয়ে গেছে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি।
যে বিজেপির কর্মকাণ্ড নিয়ে সদা সমালোচনায় মুখর হয় এই দুই দল তারাই আজ এই পহেলগাঁও এর ঘটনার পর কেমন বদলে গেছে। সত্যিই এটা বেশ ভালো ব্যাপার। দেশ, দেশের স্বার্থ আর দেশের নিরাপত্তা তাহলে অন্য সব গঠন মূলক কাজেও কেনো যে সরকারের পাশে দাঁড়ায় না বিরোধীরা কে জানে? আসলে কী এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, হুঙ্কার, মক ড্রিল, নানা আয়োজন সত্যিই কি বিজয়কেতন উড়িয়ে দেবার জন্য নাকি অন্যকিছু সেটা হয়তো পরিষ্কার হয়ে যাবে কিছুদিন পর। তবু এই যুদ্ধ, এই মানুষকে শিক্ষা দিতে গিয়ে পৃথিবী জুড়ে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দেওয়া। শান্তির এই বাসভূমি পৃথিবীতে অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে নিজের ক্ষমতা জহির করা। জানিনা আজকাল তো আর সেই কামান এর যুদ্ধ নয়। সেই পরমাণু অস্ত্র নিয়ে দু দেশের এই যুদ্ধ আমাদের এই খেলা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে।
