দিব্যেন্দু মজুমদার, হুগলি
বহু ইতিহাসের সাক্ষী হুগলির বলাগড়ের সোমরা বাজারের সুখারিয়া গ্রামের বিশ্বাসদের রাজবাড়ি। এই বাড়িতেই একসময় মৃণাল সেন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সেই মর্মান্তিক করুণ চিত্র সারা বিশ্বের কাছে ‘আকালের সন্ধানে’ ছবির মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। সম্প্রতি ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের শতবর্ষ পার করে এসেছি। কিন্তু তার সেই রাজপ্রাসাদ জুড়ে শুধু এখনো আকালেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। আজ সেই রাজবাড়ি ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেই যেন এক ইতিহাস।
১৯৪৩-এ সারা পৃথিবী জুড়ে যখন যুদ্ধ চলছে তখন ক্ষুধার জ্বালায় অবিভক্ত বাংলায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল ৫০ লক্ষ মানুষ। তারপর সেই দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক চিত্র নিয়ে ১৯৮০ তে মুক্তি পেয়েছিল ‘আকালের সন্ধানে’। দুর্ভিক্ষের চিত্র তুলে ধরার জন্য সিনেমায় হাতুই নামে যে গ্রামের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছিল তা আসলে বলাগড়ের সোমরা বাজার স্টেশনের কাছে সুখারিয়া গ্রামের দৃশ্য। আর এই গ্রামেই বিশ্বাসদের রাজবাড়িতে ওই চিত্রনাট্যের শুটিংয়ের জন্য মৃণাল সেন পুরো দল নিয়ে এসে উঠেছিলেন। সেই সময় কলা কুশীলবদের দলে কে ছিলেন না- মৃণাল সেন থেকে শুরু করে স্মিতা পাতিল, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দে সহ আরো অনেকেই। ‘আকালের সন্ধানে’ ছবির শুটিংয়ের সিংহভাগ জুড়ে ছিল ‘রাধাকুঞ্জ’ নামে বিশ্বাসদের এই রাজবাড়ি। আজ সেই ‘রাধাকুঞ্জ’ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সেই রাজবাড়ির সর্বাঙ্গ জুড়ে শুধু আকাল বিরাজ করছে।
রাধাকুঞ্জে প্রবেশের মুখে সেই বিরাট থাম ওয়ালা গেট যেন জানান দিচ্ছে আমি বাঁচতে চাই। গেটের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করলেই সোজাসুজি দেখা যাবে সেই দুর্গা দালান। তিন দিক ঘেরা এই দোতলা বাড়ির একতলার ঘরগুলি একসময় জমিদারির ট্যাক্স গ্রহণ ও অন্যান্য কাজের জন্য ব্যবহার হত। হুগলি জেলা নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন যিনি সেই বলাগড় বিজয়কৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান সুখারিয়া গ্রামের এই ‘রাধাকুঞ্জ’কে বাঁচানোর জন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি জানান একসময় নদীয়ার উলার নিবাসী মোস্তৌফী বংশীয় মিত্র মুস্তৌফী অষ্টাদশ শতকে উলা ত্যাগ করে সুখারিয়া গ্রামে চলে আসেন। এই বংশেরই গৃহবধূ কৃষ্ণকামিনী মিত্র মুস্তৌফীর লেখা বই ‘চিত্ত বিলাসিনী’ ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয়। আর এই বইটি ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম কোন মহিলা লেখিকার লেখা বই যা ছাপার আকারে প্রকাশ হয়। এই বাড়িতে আর এক গৃহবধূ ছিলেন কবি নগেন্দ্রবালা সরস্বতী। এই বংশেরই সন্তান রাধাজীবন ছিলেন অপুত্রক। তার মেয়ের ঘরের ছেলে ভূপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস পরবর্তীকালে রানাঘাট থেকে সুখারিয়া গ্রামে এসে জমিদারের দায়িত্ব সামলান। তখন থেকেই এই রাজবাড়ি সকলের কাছে বিশ্বাস বাড়ি বলে পরিচিত হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক এই বাড়িটি আজ ভগ্নপ্রায় অবস্থায় ধ্বংসের অপেক্ষায়। বাড়িটি সংস্কার করে যাতে পুনরায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে তার জন্য ইতিমধ্যেই পার্থ বাবুরা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। পাশাপাশি এই বাড়িতে যাওয়ার রাস্তায় একটি ফলক লাগানোর দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পার্থ চট্টোপাধ্যায় আরো জানান বলাগড়ের আশপাশের এলাকায় ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে বহু ইতিহাস। তিনি ও বলাগড়ের বহু বুদ্ধিজীবী মানুষ ও গ্রামবাসীদের দাবি ইতিহাসকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠুক পর্যটন কেন্দ্র। তাতে এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি হবে।
Jazzbaat24Bangla • Beta
Leave a comment
Leave a comment
