সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
এবার থেকে অনলাইন বিল্ডিং পারমিশন সিস্টেম বা ওবিপিএস-এ বানিজ্যিক বাড়ি তৈরির আবেদন জানানো হলে আগে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যাচাই এবং প্রস্থানপথ বাধামুক্ত কিনা তা খতিয়ে দেখেই বিল্ডিং নির্মাণের অনুমতি বা ছাড়পত্র দেওয়া হবে।
বাণিজ্যিক বাড়ির অনুমোদন সংক্রান্ত ২০ দফার নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানাল রাজ্য পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর। অন্যথায় ওয়েস্ট বেঙ্গল মিউনিসিপাল ( বিল্ডিং) রুলস ২০০৭ এবং কলকাতা মিউনিসিপাল বিল্ডিং আইন ২০০৯ অনুযায়ী অনুমোদনের আবেদন খারিজ করা হবে বলেও নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি কলকাতাযর মেছুয়া বাজারের কাছে হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় সরাসরি সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকের উপরে গাফিলতি ও নির্বিচারে অননুমোদিত দখলদারিত্বকে মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেভাবে রুফ টপসহ ছাদের জায়গায় ও সিঁড়িকে গোডাউন বা স্টোরেজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তাতেই বিপত্তি ঘটে যাওয়ার মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে রাজ্য পুর আইন
লঙ্ঘন করে হচ্ছে বলেও নির্দেশিকায় জানিয়েছে পুর ও নগর উন্নয়ন দফতর।
নির্দেশিকায় প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে যে রাজ্যে বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া সমস্ত পুর এলাকায় ৯ মিটারের থেকে বেশি প্রবেশের পথ থাকবে। এছাড়া বাণিজ্যিক বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে সল্টলেক টাউনশিপ, নবদিগন্ত টাউনশিপ গুলিতে প্লটের আকার কোনমতেই ৮ হাজার থেকে কমে অনুমতি দেওয়া হবে না। যে কোনো বিল্ডিংয়ের ছাদে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকবে। এছাড়া ছাদকে উপবিভক্ত করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে নির্দেশিকায়। ছাদের প্রবেশপথ কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এছাড়া প্রবেশপথ যেমন ছাদের দরজা, করিডোর, সিঁড়ি, বারান্দা এবং রাম্পকে পরিষ্কার ও সীমাবদ্ধ করে রাখতে হবে। এইসমস্ত জায়গায় আলোকিত করে সমস্ত বাধামুক্ত রেখেই চলতে হবে বলে কড়া ভাষায় নির্দেশিকায় জানিয়েছে পুর ও নগর উন্নয়ন দফতর। নির্দেশিকায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে এস্কেলেটর বা লিফটকে প্রস্থান হিসাবে বিবেচনা করা হবে না। তার জন্য লিফট, লবি এবং শাফ্টকে ওয়েস্ট বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিস আইন ১৯৫০ অনুযায়ী রাখতে হবে। তবেই আগুন থেকে রক্ষার পথ হিসেবে বিবেচিত হবে। সমস্ত বেসমেন্টের ন্যুনতম দুটি করে প্রস্থান থাকবে। দুটি প্রস্থান বা একটি প্রস্থান এবং করিডোরের শেষ প্রান্তের মধ্যে ভ্রমণের দুরত্ব নিয়মগুলি বজায় রাখতে হবে। ন্যুনতম সিঁড়ি এবং সিঁড়ি প্রস্থের নিয়ম অনুযায়ী সঙ্গতিপূর্ণভাবে করতে হবে। যদি বিল্ডিংয়ে বাণিজ্যিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহার করার উভয়েরই ক্ষেত্রে একাধিক দখল থাকে তাহলে নিজের প্রস্থান পথ বা সিঁড়িকে পৃথক ভাবে করা যাবে। সিঁড়িতে কোনো স্তরেই মালপত্র রাখার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। বিল্ডিংয়ের ব্যবহার অনুযায়ী প্যাসেজ বা করিডোরের ন্যূনতম প্রস্থ নিয়মের বজায় রেখেই থাকবে। সিঁড়ি আচ্ছাদন, লিফট মেশিন রুম, সাপোর্ট সহ ছাদের ট্যাঙ্ক, চিমনি, পরিষেবা সরঞ্জাম, টয়লেট, পরিবেশযোগ্য আবরণ বা বাগান যোগাযোগ সরঞ্জাম, পরিষেবা ঘর ইত্যাদির জন্য ছাদে অনুমতি দেওয়া হবে না বলে পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে নির্দেশিকায়। এছাড়া বেসমেন্টে কোনও দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ করা যাবে না। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়মাবলী পালন করার ক্ষেত্রে ফায়ার টেন্ডার চলাচলের সুবিধার্থে নিমলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন ন্যুনতম ৪ মিটারের একটি পরিষ্কার ড্রাইভওয়ে রাখতে হবে।বাধ্যতামূলকভাবে খোলা জায়গায় পার্কিং স্পেস রাখতে হবে। ড্রাইভওয়েতে বিল্ডিং থেকে প্রক্ষেপণ স্থলের স্তর থেকে ন্যুনতম ২.৫ মিটার উপরে ছাড়পত্র থাকতে হবে। আর যদি ড্রাইভওয়ে বা গাড়ির বারান্দা নিচে থাকলে নর্দমা বা তার উপকরণ, ভুগর্ভস্থ জলের জলাধার এবং সেপটিক ট্যাংকগুলিকে ভুগর্ভস্থ স্তরের উপরে তোলা যাবে না বলে উল্লেখ নির্দেশিকায়। ট্রান্সফরমার কে বাধ্যতামূলক ভাবে খোলা জায়গায় রেখে ন্যুনতম ৪ মিটার একটি ড্রাইভওয়ে প্রস্থান পথ রাখতে হবে। যাতে ট্রান্সফর্মারের সঙ্গে গাড়ির বারান্দার দুরত্ব বজায় থাকে। ফাইনাল স্টেবিলিটি রিপোর্ট বা এফএসআর , রিভাইজড ফায়ার সেফটি রেকমেন্ডেশন বা আরএফএসআর এবং ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট বা এফএসসি ও আরএফএসসি অর্থাৎ রেনেয়াল অফ ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট ছাড়া স্থানীয় সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে কোনো বিল্ডিংয়ের নির্মাণ ও অধিগ্রহণের শংসাপত্র বা অনুমতি দেওয়া যাবে না। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবিকরণের শুধুমাত্র শহরের স্থানীয় সংস্থাগুলির দ্বারা প্রযোজ্য হিসেবে বর্ণিত করে ব্যবস্থাগুলো করতে হবে। রুফ টপ, খোলা ছাদ, টেরেস বিক্রির মিউটেশনের অনুমতি দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে এই সরকারি নির্দেশিকায় পুরসভাদের সতর্ক করে তাদেরকে নিয়মিত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা অরক্ষিত বিল্ডিংগুলি পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করতে বলা হয়েছে। বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স গুলোতে নিয়মিত নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে পুর ও নগর উন্নয়ন দফতর।
মূলত, প্রোমোটর, বাড়ির মালিক বা ডেভেলপার অনেক সময় বাড়ি নির্মাণের অনুমতি নিয়ে বেআইনি ভাবে বাড়তি তলা তৈরি করে ফেলছে। সেক্ষেত্রে পুর ও নগর উন্নয়ন দফতর একটি গাইডলাইন ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তাই রাজ্যের সাধারণ মানুষ থেকে বাড়ির মালিক, প্রোমোটর, ডেভেলপার, পুরসভা ও পুর নিগমগুলির জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করল পুর ও নগর উন্নয়ন দফতর।
