সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
২০ মে। রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে রেড লেটার ডে। আজ থেকে ঠিক ১৪ বছর আগে মহাকরণকে ‘ জনতার দরবার ‘ বানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই পালাবদলের দিন রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে রেড লেটার ডে হিসেবে চিহ্নিত। রাজভবনে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়ে কলকাতার রাজপথে হেঁটে মহাকরণে ঢুকেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মহাকরণের সামনে বিপুল জনজোয়ারের জেরে জনতার মুখ্যমন্ত্রীকে নিজের কক্ষে ঢুকতে হয়েছিল পিছনের গেট দিয়ে। কারণ মহাকরণের অলিন্দে তখন শুধু মাথা আর মাথা। সাড়ে তিন দশক পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সেই সন্ধিক্ষণের দিন হল ২০ মে। ২০১১ সালের ১৩ মে ভোটবাক্সে ঘাসফুলের জোয়ার এনে রাজনৈতিক পালাবদলের সূচক তৈরি করেছিলেন কালীঘাটের এক চিলতে ঘরের সংগ্রামী মেয়ে। তার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ২০ মে মহাকরণে ৩৪ বছরের বাম জামানার কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যাযের নেতৃত্বে পালাবদলের সরকারের পথচলা শুরু হয় আজ তা পায়ে পায়ে ১৫ বছরে পদার্পণ করল।
‘৭৭ সালে তিন দশকের কংগ্রেস জমানার অবসান ঘটিয়ে বামপন্থীরা যে মহাকরণের দখল নিয়েছিল সেদিনের পর ২০১১ সালের ২০ মে-র মহাকরণ আক্ষরিক অর্থেই ছিল নজিরবিহীন।
কি হয়েছিল সেদিন ? বলা যায় লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি পূরণের মাহেন্দ্রক্ষণ তৈরি হয়েছিল দিনভর। ব্রিগেড ময়দানে সিপিআইএমের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর যে সঙ্কল্প নিয়েছিলেন মমতা সেই লক্ষ্যপূরণের উৎসবের আমেজ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে সরকারি সিলমোহর দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরির মঞ্চ প্রস্তুত ছিল মহাকরণ জুড়ে। প্রথম দিন মহাকরণের কাজ চলেছিল রাত প্রায় সাড়ে বারোটা পর্যন্ত। সন্ধে ছ’টা নাগাদ
মা-মাটি-মানুষকে উৎসর্গ করা সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক হয় প্রথম দিনেই। যার প্রথম ও অন্যতম সিদ্ধান্ত ছিল সিঙ্গুরে শিল্পের জন্য অধিগৃহীত ৪০০ একর জমি চাষীদের ফিরিয়ে দেওয়া। এছাড়াও বাম জমানায় সাঁইবাড়ি থেকে আনন্দমার্গী হত্যা, কেশপুর থেকে নন্দীগ্রামে সন্ত্রাস-হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১১ টি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি রাজ্যে কর্মনাশা বনধ কালচার বন্ধ করতে হবে বলেও সিদ্ধান্ত নেয় পালা বদলের রাজ্য সরকার। নতুন সরকারের অভিমুখ কি হবে তা ঠিক করতে প্রথম দিন গভীর রাত পর্যন্ত মহাকরণে থাকেন মুখ্যমন্ত্রীসহ সমস্ত মন্ত্রীরাই। মুখ্যমন্ত্রীসহ পালাবদলের সরকারে মোট ৪২ জন মন্ত্রিত্ব পান। এদের মধ্যে পূর্ণ মন্ত্রী হন ২৯ জন, স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন ৫ জন এবং রাষ্ট্রমন্ত্রী ৮ জন। সরকার গঠনের পর প্রথম এক সপ্তাহ জুড়ে একাধিক সরকারি হাসপাতাল, আলিপুর বডিগার্ড লাইন, নব মহাকরণ ভবনে আচমকা হানা দিয়ে কাজকর্ম কিভাবে চলছে তা পরিদর্শন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় মুখ্যমন্ত্রীর যাতায়াতের জন্য কলকাতার রাজপথে আলাদা করে যান নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রয়োজনে সাধারণ সিগনালে দাঁড়াবে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি। সবচেয়ে বড় কথা সেই প্রথম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে হাতজোড় করে রাজপথে গাড়ি চড়ে যেতে দেখে কলকাতা। প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে আরও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিল পরিবর্তনের সরকার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ২ লক্ষ ৩ হাজার কোটি টাকার দেনা মাথায় নিয়ে পালাবদলের সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারি সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে মহাকণের রোটান্ডায় সরকারি কর্মচারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাদের অভাব অভিযোগের কথা শুনে যথাসাধ্য সমাধানের চেষ্টার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন সরকার পরিচালনার জন্য কর্মীদের সাহায্যের আবেদন জানানো হয় পরিবর্তনের সরকারের পক্ষ থেকে। আলাদা আলাদা একগুচ্ছ সংগঠন নয় সরকারি কর্মচারীদের এক ছাতার তলায় এনে একটি সংগঠন করা হোক এমন আবেদনও করা হয় নতুন সরকারের পক্ষ থেকে। এমনি বকেয়া মহার্ঘ্যভাতা সহ পে কমিশনের দাবিতে উত্তাল রাজ্য সরকারি কর্মীদের রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির হাল বুঝিয়ে এবং তাদের দাবি দাওয়া সহানুভূতি সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে প্রথম ছয় মাস কোন আর্থিক বৃদ্ধি ছাড়াই সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করে নেন মমতা। প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা যদি মমতা সরকারের মাস্টার স্ট্রোক হয় তাহলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহেই একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয় পরিবর্তনের সরকার। বন্দি মুক্তি কমিটির দাবি বিবেচনার জন্য প্রাক্তন বিচারপতি মলয় সেনগুপ্তের নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যা ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও। পাশাপাশি জঙ্গলমহলের জন্য দু’টাকা কিলো দরে চাল দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেয় মমতার সরকার। এই সময়ের মধ্যেই বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরো সায়েন্সের অধিকর্তাকে কর্তব্যে গাফিলতির কারণে সাসপেন্ড করা, আয়লা বিধ্বস্ত এলাকায় নদী বাঁধ তৈরির জন্য জমি আধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত, পাহাড়ের শান্তি রক্ষার জন্য বিমল গুরুং এর সঙ্গে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের মান উন্নয়নের জন্য নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেন এবং সুগত বসুকে মেন্টর হিসেবে নিয়োগ করা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য সরকারি পদক্ষেপ।
শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই-সংগ্রাম নয়, এই রাজনৈতিক পালাবদলের নেপথ্যে রয়েছে বহু মানুষের আত্মত্যাগ বা বলিদান। তাই রাজনৈতিক পালাবদল সম্পূর্ণ করে যে নতুন সরকার ২০১১ সালের ২০ মে পথ চলা শুরু করার ঠিক আগের দিন অর্থাৎ ১৯ মে কলকাতার মহারাষ্ট্র নিবাস হলে একটি সাধারণ সভার ডাক দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা অজিত পাঁজা ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের এই সাফল্যকে মা-মাটি-মানুষকে উৎসর্গ করেছিলেন। যেহেতু পর দিন শপথ তাই নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য কে কে হবেন তা ঠিক হলেও এই সভায় ঘোষণা করা হয়নি। শুধুমাত্র এই নতুন সরকারের বিধানসভায় মুখ্য সচেতকের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি ‘৯৮ সালে তৃণমূল প্রতিষ্ঠার সময় ছিলেন একমাত্র দলীয় বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। “বহু মানুষের আত্মবলিদান ও প্রত্যাশার ফসল এই পরিবর্তনের সরকার। তাই ২০১১ সালের ২০ মে প্রকৃত অর্থেই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে রেড লেটার ডে।” স্মৃতি হাতড়ে অকপটে জানান পালাবদলের সরকারের প্রথম চিফ হুইফ।
