ওয়াকফ অ্যাক্ট (সংশোধনী) ২০২৩-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আজ এক টানা দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রায় চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা শুনানিতে, ভারতের প্রখ্যাত আইনজীবীরা সংশোধিত ধারাগুলিকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে চ্যালেঞ্জ জানান।
শুনানির শুরুতেই বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিব্বল যুক্তি তুলে ধরেন যে, ২০২৩ সালের সংশোধনী অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার ওয়াকফ বোর্ডের গঠন, কার্যপ্রণালী ও সিদ্ধান্তগ্রহণে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। তার মতে, এই ধরনের হস্তক্ষেপ সংবিধানের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যেখানে ধর্মীয় সংস্থাগুলিকে তাদের নিজস্ব বিষয় পরিচালনার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। সিব্বলের বক্তব্য ছিল, এই সংশোধনী রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে বিভাজনের নীতি লঙ্ঘন করে এবং এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে দুর্বল করে তোলে।
এরপরেই পি চিদাম্বরম আদালতের সামনে বক্তব্য রাখেন এবং বলেন, ওয়াকফ বোর্ডের ওপর কেন্দ্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে তা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি আরও বলেন যে, এই সংশোধনী ‘মূল কাঠামো তত্ত্ব’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বশাসনের অধিকার হরণ করে। তাঁর মতে, ধর্মীয় সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত নয়, বিশেষত যদি তা সংবিধান-নির্দিষ্ট মৌলিক অধিকারের অংশ হয়।
সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা পাল্টা যুক্তি তুলে ধরে বলেন যে, এই সংশোধনী কেবলমাত্র প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, কার্যকারিতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে। তাঁর দাবি, বোর্ডের ওপর পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা থাকা মানে এই নয় যে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন হচ্ছে। বরং এটি এক ধরনের ‘রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক’, যা দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই পড়ে।
শুনানির সময় বিচারপতিরা একাধিকবার এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন যে, সংবিধানের ২৫, ২৬ ও ৩০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের স্বশাসন কতটা সুরক্ষিত থাকবে, যদি এই সংশোধনী কার্যকর থাকে। আদালত বিষয়টির গভীরতা অনুধাবন করে এবং জানান যে, এই মামলার রায় সংবিধানের ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় সংস্থার স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করবে।
এদিনের শুনানির শেষে আদালত জানায়, বিষয়টি এখনও বিচারাধীন এবং আগামী সপ্তাহে ফের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সীমারেখা ঠিক করতে এই মামলার রায় যে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
