২০২৬ এর ৩১ মার্চের মধ্যে ভারতের মাটি থেকে মাওবাদী কার্যকলাপ সমূলে উৎখাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অমিত শাহ! আর এরপরেই গত কয়েকমাস ধরে ছত্তিসগড় সহ একাধিক মাও প্রভাবিত এলাকায় বিশেষ অপারেশন চালাচ্ছে যৌথবাহিনী। গত কয়েকমাসে এই অভিযানে বহু মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা ঘিরে ধরে চলছে প্রত্যাঘাত। তেমনই আজ বুধবার ছত্তিসগড়ের নারায়ণপুর জেলায় বিশেষ অপারেশন চালায় ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ গার্ড (District Reserve Guard (DRG)।
সূত্রের খবর, কয়েকঘণ্টা ধরে চলে এই অপারেশন। আর তাতে মাওবাদী শীর্ষ নেতা তথা কমান্ডার নাম্বালা কেশব রাও (Nambala Keshava Rao) তথা বাসব রাজের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে আরও ২৭ জন মাওবাদীর। যা নিয়ে উচ্ছ্বসিত নরেন্দ্র মোদী সরকার। এদিনের এহেন সাফল্যকে ‘যুগান্তকারী’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন শাহ। তবে নাম্বালা কেশব রাও’য়ের মতো মাওনেতার মৃত্যুর পর মাওবাদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন নাম্বালা কেশব রাও?
ভারতে একাধিক মাওবাদী হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন বাসব রাজ। ২০০৩ সালের আলিপিরি বোমা হামলার (2003 Alipiri bomb attack) ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন এই মাওনেতা। এই ঘটনায় তৎকালীন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এমনকী ২০১০ সালে দান্তেওয়ারায় (Dantewada ambush) ভয়াবহ মাওবাদী হামলার ঘটনা ঘটে, যা ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলির মধ্যে একটি। ওই ঘটনায় ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হন।
এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিআরপিএফের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, মৃত মাওনেতা শুধু এম টেক ডিগ্রিধারীই নন, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও খুব দক্ষ ছিলেন। বিশেষ ভাবে গেরিলা যুদ্ধ, আইইডি মোতায়েন সহ একাধিক ক্ষেত্রে ছিলেন পারদর্শী। ওই আধিকারিকের কথায়, দেশজুড়ে মাওবাদীদের একটা নেটওয়ার্ক তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন কেশব রাও। এমনকী মাওবাদীদের ট্রেনিং দেওয়া থেকে শুরু করে একাধিক ক্ষেত্রে অবদান ছিল। এছাড়াও দূরদর্শিতা এবং অভিজ্ঞতা তাঁকে সিপিআই (মাওবাদী)-এর জন্য অপরিহার্য ছিল বলে মত ওই আধিকারিকদের। ফলে তাঁর মৃত্যু একটা শূন্যতা তৈরি করবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা আধিকারিকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাসব রাজুর মৃত্যু কৌশলগত দিক থেকে তো বটেই, মানসিকভাবেও মাওবাদীদের কাছে বড় ধাক্কা। মাথার দাম ছিল এক কোটি। তিনি যে শুধুই একজন মোস্ট ওয়ান্টেড মাওবাদী ছিলেন তাই নয়, মাওবাদী কার্যকলাপের অন্যতম মাথা ছিলেন তিনি। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করতেন অনেক মাও নেতা। ফলে তাঁর মৃত্যুতে নেতৃত্বের অভাব দেখা দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এমনকী নব্য মাও নেতারা উৎসাহও হারাতে পারেন বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
অনেকেরই বয়স হয়েছে!
শীর্ষ মাওবাদী নেতাদের মধ্যে এখন মুপাল্লা লাক্সমানা রাও (Muppala Laxmana Rao) রয়েছেন। গণপতি, রামান্না, শ্রীনবাস সহ একাধিক নামেও তিনি পরিচিত। তবে এই মুহূর্তে তাঁর পক্ষে কতটা নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন আছে! সর্বভারতীয় ওই সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শীর্ষ এই মাওনেতার বয়স ৭৪। বর্তমানে সিপিআই (মাওবাদী) এর উপদেষ্টা এবং বর্ষীয়ান সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আরও এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ হল মাল্লোজুলা ভেনুগোপাল (Mallojula Venugopal)। ভূপতি, ভিনু সহ একাধিক নামে পরিচিত। তাঁর বয়স এখন ৬৮। বর্ষীয়ান সিনিয়র সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য ভেনুগোপাল, এমনটাই দাবি ওই সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে। বর্তমানে মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অন্যদিকে মিশির বেরশা (Mishir Besra) বলে আরও এক মাওবাদী নেতার নাম আসছে। যিনি ভাস্কর কিংবা সুরনিমল হিসাবে পরিচিত। তাঁরও বয়স প্রায় ৬৫। ফলে তাঁর পক্ষেও নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয় বলছেন বিষেশ্লকরা।
ওই সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মল্লজুলা বেনুগোপাল (Mallojula Venugopal) এবং চন্দরী যাদব (Chandari Yadav) বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন শীর্ষনেতাদের মধ্যে আছেন। এছাড়াও এখন প্রায় ১২ জন মাওবাদী নেতা যারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন, তাঁরা মাওবাদী অভিযানকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে দাবি। তবে যেভাবে নিরাপত্তা বাহিনী সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করেছে তাতে গত কয়েকমাসে একাধিক মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে। ফান্ড একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলেও মত।
মাওবাদী খুঁজতে পরপর অভিযান
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে মাওবাদীর সংখ্যা।
২০২৫ সালের প্রথম ৫ মাসেই ১৯৭ জন মাওবাদীকে নিকেশ করেছে যৌথ বাহিনী।
২০১৪ সালে ৩৫টি জেলা ছিল ব্যাপকভাবে মাও অধ্যুষিত। ২০২৫-এ সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬।
২০১৪ সালে সব মিলিয়ে মাও অধ্যুষিত জেলার সংখ্যা ছিল ১২৬। ২০২৫-এ সেটা কমে হয়েছে ১৮।
মাওবাদী হামলার ঘটনাও কমেছে। ২০১৪-তে ৭৬টি জেলার ৩৩০টি থানায় ১০৮০টি হামলার রেকর্ড ছিল। ২০২৪-এ ৪২টি জেলায় ১৫১টি থানায় হামলার ঘটনার রেকর্ড কমে হয়েছে ৩৭৪টি।
২০১৪-তে মাও হানায় শহিদের সংখ্যা ছিল ৮৮। ২০২৪-এ সেই সংখ্যা কমে হয় ১৯।
২০১৪-তে ৬৩জন মাওবাদীকে নিকেশ করা হয়েছিল, ২০২৫-এ সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২০৮৯।

