সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
ফের নীতি আয়োগের বৈঠক বয়কট করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু মুখ্যমন্ত্রী নয়, এবারের বৈঠকে রাজ্যের কোনও প্রতিনিধি থাকবেন না বলে নবান্ন সুত্রে খবর। আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে নীতি আয়োগের বৈঠক দিল্লিতে । কিন্তু এই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের কোনও প্রতিনিধি থাকছেন না। গতবারই নীতি আয়োগের বৈঠকে যোগ দিলেও বৈঠকে তাঁকে অপমানিত হতে হয়েছে, বক্তব্যের মাঝপথে তাঁর মাইক বন্ধ করার অভিযোগও তুলেছিলেন মমতা। সেকরণেই নিজের বক্তব্য সম্পূর্ণ না করেই বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। ফিরে এসে জানান আর কোনদিন নীতি আয়োগের বৈঠকে যাবেন না তিনি। নিজের দাবি বজায় রেখে এবছরের নীতি আয়োগ বৈঠক বয়কট করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গতবার নীতি আয়োগের বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার আগেই এই মঞ্চকে বাংলার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাংলাকে বাজেট বঞ্চনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এমনকি ভৌগোলিক বিভাজনের কেন্দ্রীয় চক্রান্ত করার প্রতিবাদে নীতি আয়োগের মঞ্চকে প্ল্যাটফর্ম করার আভাস দিয়ে দিল্লি যান মমতা। নীতি আয়োগের নয়া নিয়ম অনুযায়ী বৈঠকের সাতদিন আগেই রাজ্যের বক্তব্য পাঠিয়ে দিতে হয়। এই নিয়মকে মান্যতা দিয়ে রাজ্যের বক্তব্য দিল্লিতে পাঠানোর পর কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। যদিও কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলাকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে দাবি করে রাজ্য। শুধু বাজেট বঞ্চনাই নয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-নেত্রীরা বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। ভৌগলিকভাবে শুধু বাংলাকেই নয় আসাম ঝাড়খণ্ডকেও টুকরো টুকরো করার চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে প্রতিবাদের জায়গা হিসেবে নীতি আয়োগের বৈঠকের মঞ্চকেই কাজে লাগান মুখ্যমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রতিবাদের অঙ্গ হিসেবেই এবছরের বৈঠক থেকেও দূরত্ব বজায় রাখলেন কৌশলী মমতা। তবে এটাই প্রথম নয় মোদি সরকারের উদ্যোগে এবছর নিয়ে মোট ১০ বার নীতি আয়োগ বৈঠক হল যার মধ্যে তিনবার এই বৈঠকে যোগ দেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
২০১৮ সালে প্রথমবার নীতি আয়োগ এর বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন মমতা। সেবার প্রথমে ১৬ই জুন ঈদের দিনে নীতি আয়োগ এর বৈঠক ঘোষণা করা হয়েছিল মোদি সরকারের পক্ষ থেকে। ঈদের দিনে তিনি যেতে পারবেন না একথা জানিয়েছিলেন মমতা। তারপর বৈঠকের দিন বদল করে ১৭ই জুন করা হয়েছিল। অন্যান্য মুখ্যমন্ত্রীদের অনুরোধ মেনে ঈদের দিন কলকাতায় থেকে পরদিন ফের দিল্লিতে গিয়ে নীতি আয়োগের বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন মমতা।
২০১৪ সালে মোদি সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালের পয়লা জানুয়ারি নীতি আয়োগ গঠনের ঘোষণা করা হয়। সেই মোতাবেক ২০১৫ সালে প্রথম নীতি আয়োগের বৈঠক ডাকা হয় দিল্লিতে। সেই বৈঠকে যাননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । ২০১৫ ২০১৬ এবং ২০১৭ পরপর ৩ বছর নীতি আয়োগের কোন বৈঠকই যোগদান নেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ২০১৬-তে নিজে না গিয়ে রাজ্যের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র কে পাঠিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক তাই অমিত মিত্রকে সেই বৈঠকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
২০১৮ তে মমতা নীতি আয়োগের বৈঠকে যোগ দিলেও ২০১৯-এ তিনি ফের এই বৈঠক এড়িয়ে যান। ২০২০-তে করোনার জন্য বৈঠক স্থগিত থাকলেও ২০২১-এ এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তাতে অংশ নেননি মুখ্যমন্ত্রী। ২০২২ এ ফের নীতি আয়োগের বৈঠক হয় দিল্লিতে যে বৈঠকে মমতা নিজে উপস্থিত ছিলেন। একইসঙ্গে ২০২২ এর নীতি আয়োগ বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তারের পর নীতি আয়োগ এর বৈঠক হয় ২০২২-এ। সেবার নীতি আয়োগের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি নিয়ে ব্যাপক সুর চড়িয়েছিলেন এবং বৈঠকের আগের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে একান্তে সাক্ষাতও করেছিলেন।
ফের ২০২৩-এর নীতি আয়োগ বৈঠকে গরহাজির ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। গতবছর ২০২৪-এ নীতি আয়োগের বৈঠকে যোগ দিলেও বাংলার বঞ্চনা নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বৈঠকের মাঝপথেই বেরিয়ে আসেন মমতা। কলকাতায় ফিরে জানিয়ে দেন আর কোনওদিন নীতি আয়োগের বৈঠকে যাবেন না তিনি।
