শিল্প “পরিবেশবান্ধব”, গাছেদের পুনর্বাসন দিয়ে বোঝালো ডেউচা-পাঁচামি কয়লা প্রকল্প
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
শিল্প স্থাপন ও পরিবেশ ধ্বংস এই দুইয়ের মধ্যে বৈরিতা দীর্ঘদিনের। শিল্পাঞ্চলের জন্য একের পর এক গাছ কেটে ফেলা নিয়ে মামলার ভার বয়ে চলেছে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট। তবে সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী বীরভূমের ডেউচা-পাঁচামি কয়লা প্রকল্প। প্রকল্প শুরুর সময় একই আশঙ্কা দানা বেঁধেছিল ডেউচা-পাঁচামি কয়লা প্রকল্প লাগোয়া এলাকার বাসিন্দাদের। এলাকার ৬০০ এ গাছ কি কাটা পড়বে এই কয়লা প্রকল্পের জন্য? প্রকল্পের শুরু থেকেই তা নিয়ে যেমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল তেমনি শুরু হয়েছিল বিরোধিতাও। যদিও প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি ছিল পরিবেশ ধ্বংস করে এই প্রকল্পের কাজ করা হবে না। গাছ কাটা হবে না বরং গাছেদের পুনর্বাসন দিয়ে এই প্রকল্পের কাজ করা হবে বলে জানিয়েছিল রাজ্য প্রশাসন। সেই মোতাবেক এখনও পর্যন্ত প্রায় হাজার খানেক গাছ পুনর্বাসন পেয়েছে প্রকল্প লাগোয়া এক কিলোমিটার দূরের এলাকায়। এখনো কিছু গাছ পুনর্বাসন পেতে অপেক্ষা করছে। তারপরই গোটা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ করবে রাজ্য প্রশাসন। অবশ্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই ডেউচা-পাঁচামি কয়লা প্রকল্পকে গ্রিনফিল্ড প্রজেক্ট বলে বিবৃত করেছেন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, জোকা বিবাদীবাগ মেট্রো প্রকল্পের ক্ষেত্রেও কলকাতা ময়দান এলাকার হেরিটেজ গাছগুলিকে পুনর্বাসন দিয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। যা নিয়ে হাইকোর্টে মামলা হলেও প্রশাসনিক রিপোর্টে সন্তোষ প্রকাশ করেছে আদালত এমনকি পরিবেশপ্রেমীরাও।
প্রস্তাবিত ডেউচা-পাঁচামি কয়লা প্রকল্পের মোট ৩২৬ একর এলাকার মধ্যে রয়েছে বীরভূমের মহম্মদবাজার ব্লকের ভাঁড়কাটা পঞ্চায়েতের চাঁদা সরকারি মৌজার ১২ একর জমি। যেখানে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই এই কয়লা প্রকল্পের উত্তোলনের জন্য জমি খননের কাজ শুরু হয়েছে। খননকার্য শুরু হওয়ার পাশাপাশি সরকারি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গাছ পুনর্বাসনের কাজও সমানতালে শুরু হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এই পুনর্বাসনের কাজ চলতে থাকে। ইতিমধ্যেই ধাপে ধাপে ৯৮০ টির বেশি গাছকে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে যাদের মধ্যে অনেকেরই নতুন করে ফুল পাতা গজিয়েছে। আর দু’তিন দিনের মধ্যেই গাছে দিদি পুনর্বাসনের কাজ সম্পূর্ণ হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে। রাজ্য সরকারি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের খনকার্য এলাকায় কঠিন লাল মাটির মোরামের পড়ি মিলেছে নরম পাথরের স্তর। এর নিচে স্তরেই রয়েছে কঠিন ব্যসল্ট। এই কঠিন ব্যাসল্ট তরের কাজ শেষ হলেই মিলবে কয়লার খোঁজ। আর তারপরেই শুরু হবে কয়লা উত্তোলনের কাজ।
রাজ্য সরকার যখন এই এলাকায় প্রথম কয়লা প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছিলেন তখন থেকেই এলাকার কয়েকশো গাছের ভবিষ্যৎ কি হবে তা নিয়ে আশঙ্কায় ছিলেন স্থানীয় মানুষজন। প্রাথমিকভাবে গাছ কাটা চলবে না বলে বিরোধিতাও শুরু হয়েছিল সামাজিক স্তরে। স্থানীয় প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্যের কথা ভেবে রাজ্য প্রশাসনও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে পরিবেশ রক্ষা করেই এই প্রকল্পের কাজ হবে এবং প্রতিটি গাছকে সুস্থ ও সবলভাবে পুনর্বাসন দেওয়া হবে। ধাপে ধাপে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজে এগোই রাজ্য সরকার। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন ” প্রথম প্রথম আমরা গাছ কাটার বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু রাজ্য প্রশাসন প্রতিটি গাছকে পুনর্বাসন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং সেই কাজও তারা শুরু করেন। আমরাও গাছগুলির পুনর্বাসনে যথাসাধ্য সাহায্য করেছি। পুনর্বাসন পাওয়া প্রতিটি গাছ সুস্থ আছে। নূর বাসনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে এই গাছগুলিকে পুজো দিয়ে বরণ করে নেয়া হবে।” পাথুরে এলাকা হওয়ায় একটু বেশি বৃষ্টি হলেই এলাকায় জল দাঁড়িয়ে যায়। বৃষ্টির প্রকোপ কমলেই পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে। আর সেই সঙ্গে প্রকৃতির দান প্রকৃতিবাসীকে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ সাঙ্গ করা হবে।
