সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সামনে রেখে এবার রাজ্য ও রাজ্যপাল সংঘাতে নয়া মোড়। আগামী ৯ জুন থেকে রাজ্য বিধানসভার বাদল অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এই অধিবেশনে রাজভবনে আটকে থাকা একাধিক বিল এবং বিধানসভায় ফিরিয়ে দেওয়া বিল নিয়ে একটি বিশেষ রেজুলেশন বা প্রস্তাব আনা হতে পারে। সরকার পক্ষ বাট ট্রেজারি বেঞ্চের তরফ থেকে ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনের আবেদন জানিয়ে একটি প্রস্তাব তারা হতে পারে বলে সোমবার ইঙ্গিত দিলেন রাজ্য বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হওয়া বিল রাজ্যপাল কতদিন পর্যন্ত আজকে রাতে পারেন তার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে এই নির্দেশকে আইনে পরিণত করতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন। যেহেতু তামিলনাড়ুর ঘটনার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেরও মিল রয়েছে সে কারণে রাজ্য বিধানসভায় সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে সমর্থন জানিয়ে এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনের আবেদনের প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদে পাঠানো হতে পারি বলে জানিয়েছেন বিধানসভার অধ্যক্ষ। যদিও সরকার পক্ষ বিধানসভার বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটি সর্বোপরি লিডার অফ দা হাউস তথা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বলেও জানিয়েছেন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়।
মূলত, রাজভবনের সঙ্গে নবান্নের সংঘাতে রাজ্যের ১৭ টি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো উপাচার্যহীন। উল্টে নতুন করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকেও অব্যাহতি দিয়েছেন রাজ্যপাল। এই পরিস্থিতিতে রাজভবনের বিরুদ্ধে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের আঙুল তুলে তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকেই হাতিয়ার করতে চাইছে রাজ্যের শাসকদল। ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করে এবং তাকে হাতিয়ার করে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে চাইছে দ্য এডুকেশনিস্ট ফোরাম। এই উদ্দেশ্যে ফোরামের পক্ষ থেকে সাত সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রাক্তন ডিন ও আইনজীবী রয়েছেন। এই সাত সদস্যের কমিটি তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছে সেই নির্দেশনামা খতিয়ে দেখে এবং রাজ্যের প্রেক্ষিতে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে রাজ্যপাল যে একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বা দীর্ঘসূত্রিতা করছেন তার মোকাবিলায় কি করা যায় তা পাবলিক ফোরামে জানাবেন এবং রাজ্য সরকারকে রিপোর্ট দেবেন।
উল্লেখযোগ্য, তামিলনাড়ুর রাজ্যপালের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছিল তামিলনাড়ু সরকার। মামলার পিটিশন অনুযায়ী রাজ্যপাল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দশটি বিল আটকে রেখেছেন যা তামিলনাড়ু বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছিল। রাজ্য সরকারের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করে প্রশাসনিক কাজকর্ম ব্যাহত করার চেষ্টা করছেন রাজ্যপাল বলে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ জানায় তামিলনাড়ু সরকার। অভিযোগ খতিয়ে দেখে এবং দুপক্ষের সওয়াল জবাব শেষে গত ৮ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি আর মহাদেবন এর বেঞ্চ আটকে থাকা ওই ১০ টি বিলকে আইনে পরিণত করার নির্দেশ দেন। বিলের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যপাল তো বটেই এমন কি রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেও বিল পাশের সময় মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যগুলির স্বাধীনতা রক্ষায় এবং রাজ্য প্রশাসনের সুষ্ঠু পরিচালনার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে ঐতিহাসিক বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও সম্পতি রাষ্ট্রপতি রাজ্যপালদের ক্ষেত্রে এভাবে সময় মেয়াদ নির্দিষ্ট করা যায় কিনা তার আইনি ব্যাখ্যা সুপ্রিম কোর্টের কাছে জানতে চেয়েছেন। তবে তামিলনাড়ুর এই পরিস্থিতির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পূর্ণ মিল রয়েছে একথা মনে করেই সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে উদাহরণ হিসেবে যুক্তি দেখিয়ে এবং সংবিধানের ১৪২ নম্বর ধারাকে হাতিয়ার করে এরাজ্যেও উপাচার্য নিয়োগের রাস্তা সুগম করতে চায় রাজ্য। তামিলনাড়ুর মতই পশ্চিমবঙ্গও উপাচার্য নিয়োগ থেকে রাজ্য বিধানসভায় পাস হওয়া একাধিক বিল নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতার মনোভাব দেখাচ্ছেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস বলে অভিযোগ। সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে হাতিয়ার করেই এবার রাজ্য বিধানসভায় সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয় প্রস্তাব আনতে চায় রাজ্যে ট্রেজারি বেঞ্চ বলে জানিয়েছেন বিধানসভার অধ্যক্ষ।
