‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর এই প্রথম বাংলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৃহস্পতিবার সকালে সিকিম ঘুরে দুপুরে বাংলার মাটি ছোঁবে মোদীর বিমানের চাকা। মোদীর সফরের বেশ কিছু দিন আগে থেকেই তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল বাংলার রাজনীতির আনাচেকানাচে। ২০২৬ সালে রাজ্যে বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে বঙ্গ বিজেপি শুরু থেকেই মোদীর সফরকে ভোটের বিউগল বাজানোর সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছে। তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু মোদীর এই সফর প্রকৃত অর্থেই অন্য রকম। এতটাই, যে ইতিপূর্বে এমন সভা রাজ্যে হয়নি বললেই চলে।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে বদলে গেছে রাজনীতির চলনও। বিশেষত বাংলার। ‘অপারেশন সিঁদুর’ শেষে মোদী গিয়েছিলেন নিজের রাজ্য গুজরাতে। সেখানে মোদীর কর্মসূচিগুলির মধ্যে যে সুচারু পরিকল্পনার ছাপ ছিল, তাতে স্পষ্ট, জাতীয়তাবাদী ‘স্ট্রং ম্যান’ ভাবমূর্তি ধরে রেখেই বিহার ভোটে নামতে চলেছেন মোদী। যেখানে বিরোধীদের দিকে ছুঁড়ে মারা অবজ্ঞাসূচক কিছু বাক্য আছে কেবল, বাকিটা ভরা ‘৫৬ ইঞ্চি’র বাহাদুরিতে। ‘রুটি খাও, না হলে আমার গুলিতো আছেই’— মোদীর ভাষণের এই লাইনগুলি আসলে সেই কৌশলের নিখুঁত বিজ্ঞাপন। সেই আবহে বাংলায় আসছেন তিনি।
জানা গিয়েছে, সিকিম থেকে প্রধানমন্ত্রী আসবেন বাংলার আলিপুরদুয়ারে। সেখানকার বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগগা জানিয়েছেন, আলিপুরদুয়ার প্যারেড গ্রাউন্ডে জনসভা করবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর সওয়া ২টো নাগাদ মোদী আলিপুরদুয়ারে ‘সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন’ প্রকল্পের ভিত্তিস্থাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর তার পরের কর্মসূচি বিকেল পৌনে ছ’টায় বিহারের পাটনা বিমানবন্দরে। বঙ্গ বিজেপির দাবি, মাঝের সময়ে মোদী জনসভা করবেন আলিপুরদুয়ারে। সেখান থেকেই আনুষ্ঠানিক ভাবে বাজিয়ে দেবেন বিধানসভার লড়াইয়ের বিউগল। কিন্তু ‘সিঁদুরে মেঘের’ নীচে যে বদলে গেছে অনেক কিছু। বিধানসভা ভোটের বিউগল বাজাতে হলে মোদীকে অবশ্যম্ভাবী আক্রমণ শানাতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলকে, মমতার সরকারকে। কিন্তু যখন তৃণমূলের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলের অংশ হয়ে বিদেশের মাটিতে তাঁর সরকারকে আগলাচ্ছেন, জাতীয় স্বার্থে নিঃশর্তে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন মমতা, তখন বাংলায় এসে মোদী দুর্নীতি নিয়ে ছুটকোছাটকা তির বাদে তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ শানাবেন কী করে? এ এক আশ্চর্য সময়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বঙ্গ বিজেপির এক প্রথম সারির নেতা বলছেন, “বিউগল বাজানোর কথা বলতে হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু জাতীয় প্রেক্ষাপট বিচার করলে মোদীজি আলিপুরদুয়ার থেকে তৃণমূল বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে কড়া হামলা শানাবেন না বলেই মনে হয়। দেশের প্রেক্ষিতে যা যা বলবেন, আপাতত তা নিয়েই রাজ্যে ঝাঁপাতে হবে।” তাঁর মতে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আবহে মানুষের মনে রাজ্যের দুর্নীতি ইস্যুও এখন অপেক্ষাকৃত পিছনের সারিতে। ওই নেতা যদিও মনে করছেন, মোদীর এ বারের সভায় না হলেও, অমিত শাহের আসন্ন সভায় বিউগল বাজানো হবেই। কারণ, হাতে সময় বেশি নেই।
আরও একটি কারণে এ বারের সভা হতে চলেছে নজিরবিহীন। তা হল, রাজ্য সরকারি ‘সহযোগিতা’। সূত্রের খবর, মোদীর সভা যাতে সুষ্ঠু ভাবে শেষ হয় তার জন্য সক্রিয় প্রশাসনও। হয়ত নিছকই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কিন্তু তার একটি রাজনৈতিক দিকও খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। প্রধানমন্ত্রীর সভার ক্ষেত্রে তেমনটা হওয়াই দস্তুর। কিন্তু ভোটের বাংলা ব্যতিক্রমও দেখেছে। যাই হোক, আলিপুরের সাংসদ মনোজ নিজে জানাচ্ছেন, স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসন যথেষ্ট সাহায্য করছে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তিনি বলছেন, “সকলে মিলেমিশে সভাকে সফল করব।” উত্তরে বিজেপির সবচেয়ে বড় মুখ নিঃসৃত এই কথায় ‘এক অচেনা ইঙ্গিত’ পাচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এই আবহে সভা করতে এসে তৃণমূল-মমতা সরকারকে লাগামছাড়া আক্রমণ শানাবেন মোদী, তেমনটা হবে বলে বঙ্গ বিজেপি সন্দিহান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গ বিজেপির ওই নেতার কথা ধরলে বলাই যায়, বাংলায় এসে মোদীকে মূলত নির্ভর করতে হবে নিজের জাতীয়তাবাদী ‘স্ট্রং ম্যান’ ইমেজের উপর। সঙ্গে বঞ্চিত উত্তরবঙ্গে সরকারি গ্যাস প্রকল্পের উপযোগিতা। সর্বোপরি পাকিস্তানকে চাঁচাছোলা আক্রমণ। বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বলবেন কি? প্রশ্ন আছে তা নিয়েও। দিনের শেষে তাই বঙ্গ বিজেপির কাছে ধাঁধা, বাংলায় সভা করবেন কোন মোদী, প্রধানমন্ত্রী না বিজেপি নেতা?
