সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও ২০১৬ এসএসসি রুল অবমাননার অভিযোগ
ফের আদালতের দরজায় এসএসসি নয়া বিজ্ঞপ্তি বিতর্ক!
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রকাশিত রাজ্যের এসএসসি শিক্ষক শিক্ষিকার নয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়েও বিতর্ক! ২০১৬ এস এস সি নিয়োগ প্রক্রিয়ার রুল মেনে যে নয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি করার কথা এক্ষেত্রে তাকে মান্যতা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে যে নতুন নিয়োগ বিধি প্রকাশ করেছে রাজ্য শিক্ষা দপ্তর সেক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকাকে অমান্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আলাদা করে নম্বর দেওয়ার যে নিয়োগবিধি প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়েও আইনি যুক্তি জানতে চান মামলাকারীরা। তাই এই নয়া বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চে মামলা দায়ের করা হতে পারে বলে আদালত সূত্রে খবর। সবকিছু ঠিকঠাক চললে চলতি ছুটির সপ্তাহ শেষেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হতে পারে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। শুধু কলকাতা হাইকোর্টেই নয় যেহেতু এই মামলার নির্দেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত তাই সেই নির্দেশের অবমাননা হয়েছে ধরে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও এই নতুন এসএসসি বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা হবে বলেও খবর। যেহেতু কিছুদিন আগেই সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন এসএসসি নিয়োগ মামলায় আদালত অবমাননা মামলার শুনানি হাইকোর্টে কতটা যুক্তিযুক্ত এই কারণ জানতে চেয়ে আবেদন খারিজ করেছিল হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাকের ডিভিশন বেঞ্চ সেকারণে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে এই অবমাননা মামলা দায়ের করতে চান মামলাকারীরা।
মূলত, ২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্যানেল সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে পুনরায় নতুন করে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে ৩১-মে এর মধ্যে। ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যে নিয়োগবিধি ও পরীক্ষা পদ্ধতি অনুযায়ী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি করা হয়েছিল ঠিক সেই বিধি ও পদ্ধতি মেনে এই নয়া বিজ্ঞপ্তি করার কথা রাজ্য সরকারের। অথচ কত শুক্রবার রাজ্য শিক্ষা দপ্তর তথা স্কুল সার্ভিস কমিশন এর পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মোতাবেক নতুন ভাবে যে শিক্ষক ও শিক্ষিকা নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি সহ নয়া নিয়োগ বিধি প্রকাশিত হয়েছে তা কোনভাবেই ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার রোলকে মান্যতা দেয়নি বলে অভিযোগ। শুধু পরীক্ষা বিধি অমান্যের অভিযোগই নয় পরীক্ষা পদ্ধতির ক্ষেত্রেও ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা বিধিকে একাধিক ক্ষেত্রে অমান্য করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। ২০১৬ সালে ৫৫ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয়েছিল যা নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে করা হয়েছে ৬০ নম্বর। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকা প্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ১০ নম্বর বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষক নিয়োগের নয়া বিধিতে লিখিত পরীক্ষা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, ইন্টারভিউ, ক্লাস করানোর ক্ষমতার ওপর তৈরি হবে প্যানেল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আইনজীবীদের মধ্যে নয়া বিতর্ক তৈরি করেছে। নয়ন ইয়ক বিডিতে বলা হয়েছে লিখিত পরীক্ষা হবে OMR শিটে, ৬০ নম্বরে। ১০ নম্বর থাকবে শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য। এক্ষেত্রে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে ৬০ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পেলেই ১০ নম্বর পাবেন। ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে নম্বর পেলে ৮ নম্বর ও ৫০ শতাংশের কম পেলে ৬ নম্বর দেওয়া হবে। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার জন্য ১০ নম্বর, মৌখিক ইন্টারভিউ এর জন্য দশ নম্বর, ক্লাস নেওয়ার দক্ষতার উপর দেওয়া হবে ১০ নম্বর। কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে একাধিক সুবিধা দিয়েছে রাজ্য। সরকারি বা সরকারি নিয়ন্ত্রিত স্কুলে প্রতিবছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার জন্য পাওয়া যাবে দুই নম্বর করে। এক্ষেত্রে কারোর পাঁচ বছর বা তার বেশি শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে মিলবে পুরো ১০ নম্বর। ক্লাস নেওয়ার ক্ষমতার উপর থাকবে ১০ নম্বর। ইন্টারভিউয়ের উপর থাকবে ১০ নম্বর। অর্থাৎ কর্মরত শিক্ষকরা এই বাড়তি ৩০ নম্বরের সুবিধা পাবেন নয়া নিয়োগ বিধিতে। আর বিতর্ক দানা বেধেছে এখানেও। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যখন একটি সুনির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতে এই নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হচ্ছে সেক্ষেত্রে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আলাদা আলাদা নম্বর বা অগ্রাধিকার দেওয়ার আইনি যুক্তি কি? প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েও। ২০১৬ সালের এসএসসি চাকরি বাতিল মামলার ক্ষেত্রে ২৪ হাজার ২০৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শূন্য পদের ভিত্তিতে যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ার কথা সেই বিজ্ঞপ্তিতে অতিরিক্ত শূন্য পদ তৈরি করে আরও প্রায় ২০ হাজার শূন্যপদ যুক্ত করার আইনি সংস্থান কি? প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীদেরই একাংশ।
উল্লেখযোগ্য, নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ২৪ হাজার ২০৩ জন শিক্ষকের শূন্যপদ সহ মোট ৪৪ হাজার ২০৩ শূন্যপদে নিয়োগ হবে। যার মধ্যে নবম ও দশম শ্রেণীর জন্য ১১৫১৭, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য ৬৯১২ শূন্য পদ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রুপ সি’র জন্য ৫১৭ জন এবং গ্রুপ ডি’র জন্য ১০০০ জনের নতুন পদ তৈরি করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ১৬ জুন থেকে অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন পরীক্ষার্থীরা। আবেদন করার শেষ দিন ১৪ জুলাই। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যাদের চাকরি চলে গিয়েছে তাদেরও পরীক্ষায় বসতে হবে। সেই সমস্ত চাকরিহারারাও বিজ্ঞপ্তি অনুসারে আবেদন করবেন।
