১৯৬৫ সাল। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের পুরোদস্তুর যুদ্ধ চলছে। পাক বায়ুসেনার ফ্লাইং অফিসার কায়িস হুসেন উড়ছেন ভুজ লাগোয়া সীমান্ত দিয়ে। উচ্চতা ২০ হাজার ফুট। মাটি থেকে তিনি বার্তা পান, সীমান্তের অন্য প্রান্তে একটি বিমান বিপজ্জনক ভাবে উড়ে যাচ্ছে। আমেরিকার দেওয়া এফ- ৮৬ যুদ্ধবিমান নিয়ে কায়িস এগিয়ে যান আন্তর্জাতিক সীমান্তের দিকে। দেখতে পান, সত্যিই একটি বিমান খুব নিচু দিয়ে উড়ছে ভারতীয় সীমান্তের ও পারে। অবস্থান বিপজ্জনক। যুদ্ধ চলছে, ভারত এই দিক দিয়ে যুদ্ধের নতুন কোনও ফ্রন্ট খোলার চেষ্টা করলে রুখতে হবে। মাটি থেকে কায়িসের বিমানে বার্তা যায়, এনগেজ! ২০ হাজার থেকে কায়িস নিজের বিমানকে নামিয়ে আনেন ৩ হাজার ফুট উচ্চতায়। তার পর নিশানা করে কায়িস গোলা দাগতে শুরু করেন বিচক্রাফট বিমানটিকে লক্ষ্য করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধোঁয়ার কালো কুণ্ডলী দেখে করাচির বেসে ফিরে আসেন গর্বিত কায়িস। ঘরে গিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োয় ৭টার সংবাদ শুনতে গিয়ে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। খবরে জানানো হয়, পাকিস্তানের গোলায় ধ্বংস হওয়া প্লেনে ছিলেন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী বলবন্তরাই মেহেতা। যা শুনে কায়িসের সব গর্ব উধাও!
গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী মেহেতা ছাড়াও সে দিন মৃত্যু হয়েছিল এক সাংবাদিক-সহ আরও সাত জনের। ইতিহাসে বলবন্তরাই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, যিনি দুই দেশের যুদ্ধে, শত্রু দেশের সরাসরি আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু একজন অসামরিক মানুষকে তো মারার কথা নয় পাকিস্তানের! এই দুঃখ আর অপরাধবোধ থেকে বহুদিন মুক্ত হতে পারেননি কায়িস। ৪৬ বছর পর, ২০১১ সালে অবসরপ্রাপ্ত কায়িস হুসেনের একটি চিঠি আসে মুম্বইয়ের ফরিদা সিংয়ের হাতে। ফরিদার পরিচয়, তিনি মুখ্যমন্ত্রী বলবন্তরাই মেহেতার কন্যা। চিঠিতে সে দিনের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান কায়িস। পরে একটি সাক্ষাৎকারে কায়িস বলেন, “এখন মাঝেমাঝে আমার মনে হয়, সে দিন যদি নির্দেশ না মেনে ফিরে আসতাম… মুখ্যমন্ত্রীর প্রাণ যেত না।” কায়িস চিঠিতে বলবন্তরাই মেহেতার মেয়েকে লিখেছিলেন, ‘আমি তোমাকে বলতে চাই, সে দিন ব্যক্তিগত কোনও আক্রোশ থেকে আমি ট্রিগার চাপিনি। উপরতলার নির্দেশ পালন করেছিলাম মাত্র। যদি পারো এই বুড়ো মানুষটিকে ক্ষমা করে দিয়ো।’ ফরিদা লেখেন, ‘আমি বাবাকে হারিয়ে শিখেছি, যুদ্ধে ভাল মানুষকেও খারাপ কাজ করতে হয়। আমরা সবাই ওই বৃহত্তর দাবার বোর্ডের বোড়ে মাত্র।’
পঞ্চায়েতি রাজের জনক বলে পরিচিত বলবন্তরাই মেহেতার বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ৬০ বছর পর, বিজয় রূপাণী, যিনি ২০১৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, মৃত্যু হল এক বিমান দুর্ঘটনাতেই।
