সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
ওবিসি তালিকার সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের সমস্ত নয়া বিজ্ঞপ্তির উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিল হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। হাইকোর্টের নির্দেশিত পন্থা অবলম্বন করে যথাযথভাবে সমীক্ষার মাধ্যমে নয়া ওবিসি তালিকা তৈরি করেনি রাজ্য সরকার। এই অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার ডিভিশন বেঞ্চে রাজ্য সরকারের নয়া বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। দুদিন ধরে চলা সেই মামলার শুনানিতে মঙ্গলবার রাজ্য সরকারের ওবিসি তালিকা সংক্রান্ত সমস্ত নতুন বিজ্ঞপ্তির উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিল হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। আগামী ২৪ জুলাই কলকাতা হাইকোর্টে ফের এই মামলার শুনানি। ততদিন পর্যন্ত ওবিসি তালিকার নয়া বিজ্ঞপ্তি কার্যকর হবে না বলে জানিয়ে দিল হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। এই একই মামলা বিচারাধীন রয়েছে সুপ্রিম কোর্টেও। সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিষয়টিকে মাথায় রেখেই আপাতত অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্ত কলকাতা হাইকোর্টের।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে অনগ্রসর সম্প্রদায় উন্নয়ন সংক্রান্ত একটি কমিশন গঠন করা হয় রাজ্যে। মূলত আর্থসামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল সম্প্রদায়গুলিকে সরকারি সুযোগ সুবিধার আওতায় আনতেই এই কমিশন গঠনের ভাবনা। যাদের সুপারিশ অনুযায়ী কোন কোন সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকাভুক্ত করা হবে তা নির্ধারিত হবে। সেই অনুযায়ী ২০১০ সালে বিদায়ী বামফ্রন্ট সরকার একটি ওবিসি তালিকা তৈরি করলেও তা তখনও আইনে রূপান্তরিত হয়নি। বিধি অনুযায়ী ওবিসি তালিকা তৈরি করার পর সেটি রাজ্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হতে হবে এবং তারপর বিধানসভায় বিল আকারে তা পেশ করে সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস করতে হবে এবং তারপর সেটি আইন হিসেবে পরিগণিত হবে। ঠিক এই পন্থা মেনেই ২০১২ সালে রাজ্যে নতুন ওবিসি আইন পাশ হয়। যদিও এই আইনের মাধ্যমে তৈরি ওবিসি তালিকায় যথেষ্ট পদ্ধতিগত ত্রুটি ও গলদ রয়েছে এবং আর্থসামাজিক দিক থেকে প্রকৃত দুর্বল সম্প্রদায়গুলি এই তালিকায় স্থান পায়নি বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ উঠেছিল। পরে সেই অভিযোগ হাইকোর্টের মামলায় রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর ২০২৪ সালে বিচারপতি তবব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার ডিভিশন বেঞ্চ ২০১০ পরবর্তী রাজ্যের ওবিসি তালিকা বাতিল করে দেন। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলেও সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন গ্রহণ করেনি এবং পুনরায় তা হাইকোর্টেই ফিরিয়ে দেয়।
এরপর রাজ্যের মুখ্য সচিব হাইকোর্টে হাজিরা দেন এবং হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ যথাযথভাবে সমীক্ষা করে নতুন ওবিসি তালিকা তৈরির জন্য তিন মাস সময় দেয় রাজ্যকে। তিন মাস শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন আগেই রাজ্য সরকার নতুনভাবে ওবিসি তালিকা তৈরি করে এবং তা রাজ্য মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। নতুন ওবিসি তালিকায় ১৪০ টি সম্প্রদায় স্থান পেয়েছে যার মধ্যে ৭৪ টি সম্প্রদায়কে নতুনভাবে সমীক্ষার মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানায় রাজ্য সরকার। যদিও সমীক্ষার কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বলেও রাজ্যের তরফে জানানো হয়েছিল। এরপর বিধানসভার চলতি বাদল অধিবেশনে মন্ত্রিসভা অনুমোদিত ওবিসি তালিকা বিধানসভায় পেশ করা হয়। কোন ভোটাভুটি ছাড়াই সেই তালিকা বিধানসভায় অনুমোদিত হয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছে রাজ্য সরকারও। আর ঠিক এই জায়গাতেই প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। ২০১২ সালের ওবিসি আইন থাকা সত্ত্বেও নয়া ওবিসি তালিকা বিধানসভায় পেশ করা হয়েছে। সেখানে ২০১২ সালের আইনের কথা উল্লেখ নেই। ৯৩ সালে অনগ্রসর সম্প্রদায় কল্যাণ সংক্রান্ত কমিশনের আইনের কথা উল্লেখ রয়েছে ওই নোটিফিকেশনে। যেহেতু ইতিমধ্যেই রাজ্যে ওবিসি সংক্রান্ত আইন বলবৎ রয়েছে তাহলে সে ক্ষেত্রে নতুন করে আইন তৈরির কোনো যুক্তি থাকে না। সে ক্ষেত্রে ২০১২ সালের আইন পরিবর্তন করা বা এমেন্ডমেন্ট করে নতুন বিল পেশ করতে হয় রাজ্য বিধানসভায়। হাইকোর্ট রাজ্যের এডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্তের কাছে জানতে চায় কেন নতুন বিজ্ঞপ্তি বা বিল যেটা পেশ করা হয়েছে রাজ্য বিধানসভায় সেখানে ২০১২ সালের আইনের উল্লেখ নেই? ২০১২ সালের আইনের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে কেন তাও জানতে চায় হাইকোর্ট।
কোন আইন বলে রাজ্যে একটি সর্বসম্মতক্রমে পাস হওয়া আইন থাকা সত্ত্বেও সেই একই বিষয়ে রাজ্য সরকার নতুন করে গেজেট নোটিফিকেশন করতে পারে তারও ব্যাখ্যা চায় আদালত।
যদিও এ নিয়ে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেলের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি হাইকোর্ট। যেহেতু ওবিসি সমীক্ষা একটি বিশাল কর্মকাণ্ড বা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, সে ক্ষেত্রে এত তড়িঘড়ি কীভাবে হাইকোর্ট নির্দেশিত পন্থা মেনে এই নতুন ওবিসি তালিকা তৈরি করা সম্ভব হল, তাও এই মামলার শুনানিতে বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। মূলত এই সমীক্ষা আইন মেনে বা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী হয়নি বলেও মামলাকারী অভিযোগ জানিয়েছেন আদালতে। সবদিক বিচার বিবেচনা করে আপাতত ৩১ জুলাই পর্যন্ত রাজ্য সরকারের নয়া ওবিসি তালিকা সংক্রান্ত নোটিফিকেশন বা বিজ্ঞপ্তি কার্যকর করা যাবে না বলে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে বিচারপতি তবব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার ডিভিশন বেঞ্চ। আগামী ২৪ জুলাই ফেক এই মামলার শুনানি হবে হাইকোর্টে। সেদিন পরবর্তী সিদ্ধান্তের কথা জানাবে হাইকোর্ট। সব মিলিয়ে রাজ্যের সার্বিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ফের জটিলতা তৈরি হলো বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
