সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
সাংসদ অথবা বিধায়ক হিসেবে নিজের বক্তব্য রেকর্ড করার জন্যই শুধু সংসদ বা বিধানসভা? সরকারপক্ষের বক্তব্য অথবা কোন উন্নয়নমূলক বা জরুরি আলোচনায় অংশ নেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই? ফের বৃহস্পতিবার বিরোধীপক্ষের আচরণে এই প্রশ্নই উঠল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। সেল্ফ টেক্স সংক্রান্ত বিলের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় নিজেদের বক্তব্য শেষ করে বিজেপি বিধায়করা একে একে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। অধিবেশনে তখন বিলের উপর জবাবি ভাষণ দিচ্ছেন বিভাগীয় মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। বিরোধী পক্ষের শেষ বক্তা বিজেপি বিধায়ক অশোক লাহিড়ী সরাসরি বিলের বিরোধিতা না করলেও প্রকারান্তরে তিনি বিলটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর আবেদন জানান। নিজের বক্তব্য শেষ করে কক্ষ ত্যাগ করার মুহূর্তে বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনে ফের নিজের আসনে বসে পড়েন অশোকবাবু। কিন্তু পরমুহূর্তেই দেখা যায় কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে যাওয়া বিজেপি পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক শঙ্কর ঘোষ অশোকবাবুকে ডেকে নিয়ে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। বিরোধীদের এহেন আচরণেই খুব প্রকাশ করেন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে জবাবি ভাষণরত বিভাগীয় মন্ত্রী এমনকি রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও।
জামাবি ভাষণ শুরু করার পর মুহুর্তেই বিরোধীদের কক্ষ ত্যাগ করার প্রসঙ্গে প্রথম অধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিভাগীয় মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য নিজেই। ” এই হাউসটা কি জমিদারি? তাহলে শাসক দলের বিধায়করাও থাকতে বাধ্য নন” মন্তব্য চন্দ্রিমার।
একই দাবি পরিষদীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের।
অধ্যক্ষ্য পরিষদীয় মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন ” এটা গতকালও বলেছিলাম। প্রয়োজনে আমি ওনাদের (বিজেপি বিধায়কদের) বক্তব্য বিধানসভার কার্যবিবরণী থেকে মুছে দেব।” অধ্যক্ষ্য জানান, “সরকারপক্ষ যদি কোনও মোশন আনেন তাহলে আমি সেটা করতে পারি। আমি যথাযথ ব্যবস্থা নেব।” অর্থাৎ পরিশোধীয় ও সাংবিধানিক রীতিনীতি যথাযথভাবে পালন না করার ঘটনায় ফির বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের সিদ্ধান্তের কথা জানালেন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য বিধানসভার চলতি বাদল অধিবেশনে এই ঘটনা বৃহস্পতিবার নতুন নয়। বলা যায় প্রায় প্রতিদিনই এই ঘটনার সাক্ষী রাজ্য বিধানসভা। বিধানসভার কার্য নির্বাহী কমিটির বৈঠক হোক বা সর্বদলীয় বৈঠক এমনকি অধিবেশন চলাকালীন এ প্রসঙ্গে বারবার শাসক-বিরোধী দু’পক্ষকেই সতর্ক করেছেন অধ্যক্ষ। কিন্তু নিজেদের বক্তব্য শেষ হলেই শাসকদলের বা ট্রেজারি বেঞ্চের কথা শোনার ধৈর্য বা রীতির তোয়াক্কা করেন না বিরোধীরা এই অভিযোগ প্রতিদিনের। শুধু কোনও বিভাগীয় মন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট বিলের জবাবি ভাষণের ক্ষেত্রেই নয় মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও বহুদিন এ ধরনের ছবি দেখা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। বিরোধী পক্ষের ওয়াক আউট যেন নিত্য নৈমিত্তিক রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিধানসভার অন্দরে। বৃহস্পতিবার সেই রুটিন বন্ধ করতে এহেনও করা পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত প্রণব মুখোপাধ্যায় এই বিধানসভার ঐতিহাসিক মুহুর্তে অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত থেকে একই ট্র্যাডিশনের সাক্ষী হয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্লাটিনাম জুবিলী বা ৭৫ বছর উদযাপন উপলক্ষে রাজ্য বিধানসভায় সংসদীয় গণতন্ত্রের গৌরবময় অধ্যায় নিয়ে বিশেষ ভাষণ দিতে এসেছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এই ঐতিহাসিক ক্ষণেও শাসক তৃণমূলের বিরোধিতা করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য বয়কট করে বিধানসভার দুই বিরোধীপক্ষ বাম ও কংগ্রেস বিধায়করা। পরিস্থিতি দেখে যথেষ্ট দেশের একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি। সংসদের গরিমা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জানান “সংসদ হোক বা বিধানসভা, সংসদীয় বা পরিষদীয় কার্যক্রমে বাধা দেওয়া বা অংশগ্রহণ না করা বড় দুর্নীতি বা অপরাধের সমান। বিশেষ করে সংবিধানের অধিকারপ্রাপ্ত ভোটারদের সমর্থন নিয়ে আইনসভার সদস্য হয়ে যদি নির্বাচনী এলাকার বা স্থানীয় মানুষজনের কথা সংসদে বা বিধানসভায় কোন জনপ্রতিনিধি না তুলে ধরেন সেটা অপরাধের শামিল।”
“parliament belongs to the opposition”—
সংসদীয় গণতন্ত্রের এই আপ্তবাক্য যে শুধুই ‘কথার কথা’ তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে এমনটাই প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। সংসদীয় বা পরিষদীয় রাজনীতিতে সাংবিধানিক অধিকার বা সাংবিধানিক রীতিনীতির যে কোনও গুরুত্ব নেই সেকথা বার বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার চলতি অধিবেশন বা গত কয়েকবারের অধিবেশনও।
