সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
বর্ষার শুরুতেই রাজ্যে ফের বন্যার ভ্রুকুটি। লাগাতার বৃষ্টির জেরে ইতিমধ্যেই দক্ষিণবঙ্গে একাধিক জেলায় প্লাবন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার উপর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিভিসি। ইতিমধ্যেই নিম্নচাপ বলয় গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরে গিয়ে ঝাড়খণ্ডে পৌঁছেছে। এই অবস্থায় ঝাড়খণ্ডের আপার ক্যাচমেন্ট এলাকায় যদি মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয় তাহলে ডিভিসির জলাধার থেকে জল ছাড়া হতে পারে। এই আশঙ্কায় এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজ্য সরকারের কাছে। ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ডিভিসি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে যে রাজ্য সরকারকে না জানিয়ে যেন ডিভিসির জলাধার থেকে জল ছাড়া না হয়। সে ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার আগাম প্রস্তুতি নিতে পারে। যদিও অতীতে এ নিয়ে রাজ্য ও ডিভিসি কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্ব একাধিকবার বন্যা পরিস্থিতির জটিলতাকে বাড়িয়েছে। ডিভিসির জল ছাড়া এবং ডিভিসির জলাধারগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা এই ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীকেও একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উদাসীনতা নিয়েও একাধিকবার খুব প্রকাশ করেছেন মমতা। ডিভিসির জলাধারগুলির সংস্কার না হওয়ায় তার জল ধারণ ক্ষমতা কমছে। ফলে একটু বেশি বৃষ্টিতেই জলাধারগুলি থেকে জল ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বারংবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও আগাম খবর না দিয়ে হাজার হাজার কিউসেক জল ছাড়ছে ডিভিসি। এই অভিযোগে অতীতে বহুবার বিবিসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে রাজ্য সরকার। এবারও বর্ষা শুরু থেকেই তাই আগাম ডিভিসি কর্তৃপক্ষকে একই অনুরোধ জানিয়েছে রাজ্য।
ঝাড়খণ্ডের আপার ক্যাচমেন্ট এলাকায় অতি বৃষ্টি হলে ডিভিসির জলাধারগুলিতে অতিরিক্ত জলের চাপ যাতে না বাড়ে সেকারণে জলাধারগুলি থেকে জল ছাড়া হয়। মূলত মাইথন পাঞ্চেত অতিলপাড়া এই তিনটি ব্যারেজ থেকে জল ছাড়া হলে সেই জলের মিলিত স্রোত রাজ্যের দিকে ধেয়ে আসে এবং দুর্গাপুর ব্যারেজের মাধ্যমে নিম্ন দামোদর অববাহিকায় প্রবেশ করে। মাত্রাতিরিক্ত জল ছাড়া হলে এই জলপ্রবাহ প্রথমে নিম্ন দামোদর অববাহিকায় প্লাবন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে পূর্ব বর্ধমান থেকে তা হুগলির আরামবাগ খানাকুল গোঘাট মহকুমাগুলিতে এসে পৌঁছয়। এই একই সময় কালে, যদি রাজ্যে সেই সময় বৃষ্টিপাত চলতে থাকে তাহলে প্লাবন পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। নিম্ন দামোদর অববাহিকার প্লাবিত জল এবং হুগলির পশ্চিমাঞ্চলের এই সামগ্রিক জলপ্রবাহ হাওড়ার আমতা উদয়নারায়নপুর এলাকায় প্লাবন পরিস্থিতিকে আরো তরান্বিত করে। এই পরিস্থিতিতে বিবিসি জলাধারগুলো থেকে অতিরিক্ত জল ছাড়া হলে এবং একই সঙ্গে গাঙ্গে ও দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টিবাদের পরিমাণ বাড়লে এই সামগ্রিক জলরাশি পূর্ব বর্ধমান হুগলি হাওড়া হয়ে বাঁকুড়া এবং পূর্ব মেদিনীপুরের ঘাটাল এলাকায়। বন্যা পরিস্থিতিকে ব্যাপক করে তোলে। চলতি বর্ষার মরশুমের শুরুতেই নিম্নচাপকে সঙ্গী করে যেভাবে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে সেই আশঙ্কা থেকেই ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার গাঙ্গেয় দক্ষিণবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম সর্তকতা নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই বন্যা মানচিত্র এলাকার নদীগুলিতে জলস্তর বেড়েছে। কোন কোন এলাকায় নদীর জলসীমা বিপদসীমা ছুঁইছুঁই হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনগুলিকে নদীর জল এবং বাঁধের ওপর অতিরিক্ত নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে নবান্ন। সাধারণ মানুষ যেন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, এমন নির্দেশও নবান্ন থেকে দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই সচিব পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিনিধি দলকে একাধিক দলে ভাগ করে হাওড়া হুগলি বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের প্লাবন পরিস্থিতি পরিদর্শনে পাঠানো হয়েছে। আজ প্লাবন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে চার জেলার দায়িত্ব নিয়ে চারজন মন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। সব মিলিয়ে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে চলতি বর্ষণের শুরুতেই বন্যা পরিস্থিতির তীব্রতা কোন পর্যায়ে পৌঁছয় তার অনেকটাই এখন নির্ভর করছে ডিভিসির জলধারগুলি থেকে জল ছাড়ার নিয়ন্ত্রণের ওপরে। সে কারণেই আগাম ডিভিসি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে রাজ্য সরকার। পরবর্তীতে প্রতিবেশী রাজ্যের জলের জন্য গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি যাতে ত্বরান্বিত না হয় এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় জল সম্পদ মন্ত্রক এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেরও দ্বারস্থ হতে পারে রাজ্য সরকার।
