সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ বা বিধানসভা “বিলংস টু অপজিশন।” অর্থাৎ সংবিধান ও সংসদীয় গণতন্ত্রে আইনসভার ক্ষেত্রে বিরোধীরাই হল মূল গণতান্ত্রিক কাঠামো। অথচ দেশের এই সাংবিধানিক তথা গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বিরোধী পক্ষের ভূমিকায়
দেশের সমস্ত অঙ্গরাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ “ব্যতিক্রম” বলে মনে করেন রাজ্য বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। মূলত, রাজ্যের বিরোধী দলনেতার প্রসঙ্গ টেনে এই মন্তব্য অধ্যক্ষের। বিমানবাবু জানিয়েছেন “দেশের অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভায় বিরোধী দলনেতাকে বৈঠকের জন্য ডেকে পাঠানো হলে সমস্ত বিরোধী দলনেতা সেই বৈঠকে হাজির থাকেন। বিধানসভার কার্যবিবরণী বৈঠকে বিরোধী দল উপস্থিত থাকে। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ব্যতিক্রম। বিরোধী দলনেতা তো হাজির থাকেনি না এমনকি সর্ব দল বৈঠক ডাকলেও বিরোধীদল অংশ নেয় না। ঘর হাজির থাকে বিধানসভার কার্যবিবরণী বৈঠকেও। তাদের বক্তব্যের কথা আমরা কিছু জানতে পারি না। তাদের কি কর্মসূচি আছে তা জানানো হয় না। তাই বিধানসভা অধিবেশনেই আমাদের বক্তব্যের কথা জানানো হয়।” অধ্যক্ষ জানান সোমবার বিধানসভায় যে ঘটনা ঘটেছে তা ন্যক্কারজনক। এর আগেও একাধিকবার বিধানসভার ওয়েলে দাঁড়িয়ে বা অধিবেশন কক্ষের মধ্যে বিধানসভার নথিপত্র ছিড়ে ফেলার অভিযোগ সামনে এসেছে। অধ্যক্ষ সমস্ত বিধায়কদের এই ব্যাপারে একাধিকবার সতর্ক করেছেন। বিধানসভার নথিপত্র ছিঁড়ে ফেলা হলে শাস্তি মূলক পদক্ষেপ নেয়া হবে সে কোথাও অধ্যক্ষ একাধিকবার জানিয়েছেন। তা সত্ত্বেও সোমবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রাজ্য বিধানসভায়। অধ্যক্ষের আসনের সামনে দাঁড়িয়ে বিধানসভার কার্যবিবরণী নোটিশ ছিঁড়ে ফেলাই শুধু নয় বিভিন্নভাবে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ জানিয়েছেন খোদ বিধানসভার অধ্যক্ষ নিজেই। বারংবার নিষেধ করা সত্ত্বেও যখন বিরোধীপক্ষের বিধায়করা শোনেননি তখন বিজেপির চার বিধায়ককে চলতি অধিবেশনের জন্য সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তের কথা জানান বিধানসভা অধ্যক্ষ। তাতেও কোন সুরাহা না হওয়ায় মার্শাল ডেকে সাস্পেন্ডেড বিধায়কদের অধিবেশন কক্ষের বাইরে বার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। “কিন্তু বিধানসভার কোন নিয়মই মানেন না বিরোধীপক্ষের বিধায়করা” বলে আক্ষেপ বিধানসভা অধ্যক্ষের। বিধানসভার নিরাপত্তারক্ষীদের মারধর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিমধ্যেই ১০ জন নিরাপত্তারক্ষীর মেডিকেল রিপোর্ট তাঁর হাতে এসে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন বিধানসভার অধ্যক্ষ। একইসঙ্গে অধ্যক্ষের হুঁশিয়ারি “যদি কেউ মনে করে থাকেন অধ্যক্ষের টেবিলের সামনে এসে হুমকি-শাসানি দিয়ে বিধানসভার কাজ স্তব্ধ করবেন তাহলে তারা ভুল করছেন। গায়ের জোরে বিধানসভা বন্ধ করা যাবে না। আমার কাজ বিধানসভা পরিচালনা করা আমি বিধানসভার কাজ চালিয়ে যাব।” অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, একজন বিধায়কের পরিচয় তিনি আইনসভার সদস্য বা জনপ্রতিনিধি। সেটাই তার অন্যতম আইডেন্টিটি। সে কারণে বিধানসভা বা আইনসভার বিধি ও নিয়ম তিনি মেনে চলবেন এটাই কাম্য। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দিনের পর দিন বিধানসভার রীতিনীতি ও বিধি ভঙ্গ করছেন বিধায়করা। এ ব্যাপারে অবশ্য শাসক বিরোধী কোন নির্দিষ্ট পক্ষের নাম করে অভিযোগের আঙুল তোলেননি বিধানসভার অধ্যক্ষ। তাঁর বার্তা, “শাসক বা বিরোধী দুপক্ষই বিধানসভার নিয়মকানুন মেনে বিধানসভার কাজ পরিচালনা করতে সাহায্য করবেন এই আশা রাখি। চলতি অধিবেশনের আর একদিন বাকি। এই পরিস্থিতিতে সুষ্ঠুভাবে এই অধিবেশনের কাজ শেষ করা যাতে সম্ভব হয় সকলের কাছে সেই আবেদন রাখছি।”
যদিও সোমবারের ঘটনায় পাল্টা বিধানসভার অধ্যক্ষের দিকেই আঙুল তুলেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারি। তাঁর দাবি, “বিজেপি বিধায়করা নিরাপত্তারেক্ষীদের মারেননি উল্টে তারা মার খেয়েছেন। বিজেপি বিধায়কদের চশমা হাতঘড়ি ভেঙেছে। সেগুলো অধ্যক্ষের কাছে তথ্য প্রমান হিসেবে জমা দিয়েছি। অথচ এই ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে পাল্টা নিরাপত্তা রক্ষীদের মারধর করেছে বিজেপি বিধায়করা বলে দোষ চাপিয়েছেন অধ্যক্ষ।” এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন ” বিধানসভার অধিবেশন কক্ষে সোমবার কি ঘটনা ঘটেছে তা সকলেই দেখেছেন। নিরাপত্তা রক্ষীদের মেডিকেল রিপোর্ট আমার কাছে রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করেই চারজন বিধায়ককে সাসপেন্ড করতে হয়েছে। আশা করব এদিনের ঘটনা নিয়ে আগামীকাল চলতি বিধানসভা অধিবেশনের শেষ দিনে বিধায়করা দুঃখ প্রকাশ করবেন।”
