সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
রাজ্যের পান চাষিদের ওপর ‘নীলকর’-দের মত জুলুম বন্ধ করতে এ বার বিশেষ উদ্যোগী হল রাজ্যের কৃষি বিপণন দপ্তর। বিশেষ করে পানের নিলামে অনিয়ম এবং পান চাষিদের ন্যায্য দাম পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ধাঁচে ‘ফার্মার প্রডিউসার অর্গানাইজেশন’ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য কৃষি বিপণন দপ্তর। একই সঙ্গে সরকারি আইন মেনে পানের নিলামের ব্যবস্থা না হলে ব্যবসাদারদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পান চাষিদের বিরুদ্ধে নিলামের ‘জুলুম’ রুখতে পান চাষিদের এই গোষ্ঠীভুক্ত করে এক ছাতার তলায় আনতে চায় রাজ্য কৃষি বিপণন দপ্তর। রাজি, কৃষি বিপণন মন্ত্রী বেচারাম মান্না জানিয়েছেন, ” স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ধাঁচে এ ধরনের অর্গানাইজেশন তৈরি হলে পান চাষিরা নিজেদের পান নিজেরাই কিনবেন এবং সেই পান রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বা ভিন রাজ্যে বিক্রি করতে পারবেন। এর জন্য রাজ্য সরকার কিষাণ মাণ্ডির মাধ্যমে পান চাষিদের বিশেষভাবে সাহায্য করবে। প্রয়োজনে গাড়ি এবং সহজলভ্য ঋণের যোগান দেবে রাজ্য সরকার।” ইতিমধ্যেই পান চাষীদের হয়রানি বন্ধ করতে বিভিন্ন জেলায় নজরদারি কমিটি তৈরি করেছে রাজ্যের কৃষি বিপণন দপ্তর। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শোধরায়নি।
শুধু পান চাষিরাই নয়, রাজ্যের সমস্ত কৃষক তাঁর উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য দাম পাবে, এটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ঘোষিত নীতি। অথচ বেশ কয়েক বছর ধরেই পান চাষীদের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। পানির নিলাম থেকে ন্যায্য দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে চাষীদের বঞ্চনার কথা মেনে নিয়েছেন কৃষি বিপণন মন্ত্রীও। তাঁর মতে,
“পান চাষীদের উপর ব্যবসাদাররা নীলকরদের মত অত্যাচার চালায়। নিলাম থেকে ন্যায্য দাম দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেচ্ছাচার চালায় ব্যবসাদার থেকে আড়তদার।” যেহেতু পান পচনশীল ও সংরক্ষণ করে বেশিদিন রাখা যায় না, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পান চাষিদের উপর জুলুমবাজি দিন দিন বেড়েই চলেছে ব্যবসায়ীদের বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। এই জুলুমবাজি কিভাবে হয় তাও জানিয়েছেন বেচারাম মান্না। মন্ত্রী জানান, পানির গুছি দিয়ে প্রথম বঞ্চনা শুরু হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পানের একটি গুছিতে ৭০ টি পান পাতা থাকার কথা। ব্যবসায়ীদের চাপে এই সরকারি নিয়ম যথাযথভাবে পালন করতে পারেন না পান চাষিরা। কারণ, যার গুছিতে যত বেশি পান থাকবে তার নিলাম তত আগে হবে এটাই ব্যবসাদারদের নিয়ম। যার গুছিতে পান কম তার পান পরে নিলামে উঠবে অথবা নেওয়া হবে না। ফলে চাষীকে পান ফেলে দিতে হয় অথবা জলের দলে বিক্রি করতে হয়। পানের নিলামের পর আচমকা পানের গুছি থেকে একটা পান বের করে খারাপ দেখলেই ওই পান চাষির থেকে নিলামের দরের ২০ শতাংশ টাকা কেটে নেন ব্যবসাদার। এখানেই শেষ নয়, নিলামে যে ডর হয় টাকা দেওয়ার সময় আড়তদার ৯ শতাংশ কমিশন কেটে নেন। মূলত লেবার, মজুরি, জায়গার ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল হিসেবে এই কমিশন পান চাষীদের থেকে নেওয়া হয়। মন্ত্রীর মতে, “এটা নীলকরদের মতই জুলুম চলে পান চাষিদের ওপর।” মন্ত্রীর মতে, এই কমিশন দেওয়ার কথা চাষি, ব্যবসাদার, আড়তদার, ফোড়ে, যারা বিদেশে পান রপ্তানি করেন তাদের সকলে মিলে দেওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে পুরো কমিশনের বোঝা পান চাষির ঘাড়েই ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে চাষির লাভের গুড় খেয়ে যায় পিঁপড়ে। মন্ত্রীর মন্তব্য ” এই ধরণের জুলুম সামলাতে গিয়ে দিনের পর দিন পান চাষিরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” মন্ত্রী জানিয়েছেন, মিঠা পাতা হোক বা বাংলা পাতা পানের দাম ও চাষিদের পাওনার ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। একটি মিঠা পাতার পানের দাম স্থানীয় বাজারে এক টাকা হলে রাজ্যে বা ভিনরাজ্যে তা ৭-১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাংলা পাতার দাম স্থানীয়ভাবে ৮০ পয়সা হলে একটি পাতার বাজারমুল্য ৬-৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ পান চাষিদের ভাঁড়ার শূন্য বলেও আক্ষেপ কৃষি বিপণন মন্ত্রীর।
ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার এই বঞ্চনা রুখতে একাধিক পদক্ষেপ করেছে। নির্দেশনামা জারি করে একটি গুছিতে ৭০ টি করে পান থাকবে তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং ৭০ টি পানের গুছিতে নিলামের সর্বোচ্চ দর দিতে হবে বলে নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে। চাষি, ব্যবসাদার ও আড়তদার সবাইকে কমিশন ও অন্যান্য ব্যয়ভার বহন করতে হবে বলেও সরকারি নির্দেশিকায় জানানো হয়। পাশাপাশি জেলায় জেলায় প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে নজরদারি কমিটি তৈরি করে সংশ্লিষ্ট জেলগুলিতে পান চাষিদের সচেতন করতে বৈঠক ও সেমিনার করেছে কৃষি বিপণন দপ্তর। মূলত, দুই ২৪ পরগনা ও পুর্ব মেদিনীপুরে পানের চাষ বেশি হয়। এর মধ্যে সাগর, কাকদ্বীপ ও সুন্দরবন লাগোয়া এলাকার মিঠে পাতার পান বিদেশের বাজারেও ভাল কদর রয়েছে।কাকদ্বীপে এসডিও কে মাথায় রেখে এবং পুর্ব মেদিনীপুরে জেলাশাসককে মাথায় রেখে নজরদারি কমিটি তৈরি করা হয়েছে যাতে নিলামে বৈধতা বজায় রেখে পান চাষিরা পানের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত না হন। যদিও মন্ত্রীর মন্তব্য
“নজর রাখা সত্ত্বেও পান চাষিদের হয়রানি চলছে। যখনই জেলায় জেলায় মিটিং হয় তখন সব ঠিক চলে তারপর আবার যে কে সেই। কিন্তু আমরা বদ্ধপরিকর যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত নীতি বলবৎ রাখা হবে।” আর সরকারি নীতির বাস্তবায়নে এবং পান চাষিদের হাতে ন্যায্য দাম তুলে দিতে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ধাঁচে সংগঠন তৈরি ও অবৈধ নিলাম পদ্ধতি তথা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে করা পদক্ষেপের উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।
