শুক্রবার রথ। তার আগে রাজনীতির আঁচে তেঁতে উঠেছে বর্ষণসিক্ত বাংলা। লক্ষ চোখের কেন্দ্রে পূর্ব মেদিনীপুর। আরও স্পষ্ট করে বললে, শুভেন্দুর দিঘা। যেখানে রথের রশিতে টান দেবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির (তর্কার্থে ধাম।) প্রাঙ্গণে মহা ধুমধাম করে এ বার পালন হবে রথ যাত্রা। আসন্ন বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে এই অনুষ্ঠানকে ‘কর্মসূচি’ বানাতে চেষ্টার কসুর করছে না মমতার সরকার। মুখ্যমন্ত্রী নিজে রথ টানবেন। প্রতি বার রথের দিন তিনি কলকাতার ইস্কনে হাজির থাকতেন। এ বার ইস্কন পরিচালিত দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রায় থাকবেন। ঘটনাচক্রে, জায়গার নাম পূর্ব মেদিনীপুর। বিরোধী দলনেতা, বঙ্গ বিজেপির কট্টর হিন্দু মুখ হয়ে ওঠা শুভেন্দু অধিকারীর খাসতালুক। রথের দিন কলকাতা সেরে নিজের জেলায় রথের উৎসবে যোগ দেবেন। একই জেলায় দুই নেতার ‘কর্মসূচি’ রাতারাতি তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সকাল ৯টায় পুরোহিতদের পবিত্র পুজোপাঠ দিয়ে মন্দিরের কাজ শুরু হবে। সাড়ে ৯টার মধ্যে দলবল নিয়ে পৌঁছে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী। সাধারণ দর্শনার্থীরাও মমতার সঙ্গেই মন্দিরে যাবেন। রথ টানায় অংশ নেবেন। দুপুর আড়াইটে নাগাদ গড়াতে শুরু করবে দিঘার রথের চাকা। বিকেল ৪টের মধ্যে শেষ হবে অনুষ্ঠান। রথের দু’দিন আগেই কার্যত মন্ত্রিসভা নিয়ে দিঘায় চলে এসেছেন মমতা। নামে ইস্কনের রথ যাত্রা হলেও কাজ সবই হচ্ছে নবান্নের কড়া নজরে। মুখ্যমন্ত্রী চান, নির্বিঘ্নে ‘মেগা ইভেন্ট’ শেষ করতে। তাতে এক দিকে যেমন, হালফিলের বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম বা যোগী রাজ্যের কুম্ভ মেলার মতো ঘটনা এড়ানো যাবে, অন্য দিকে প্রচারের আলো শুষে নিয়ে শুভেন্দুকে আঁধারে ঠেলে দেওয়া যাবে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ ছাড়বেন না মমতা। তবে শুভেন্দুও চুপ করে বসে থাকার পাত্র নন। মমতা কি করতে পারেন তা আগেই আঁচ করে, গোটা দিন ধরে তিন-তিনটি রথের উৎসবে যোগ দেবেন বিরোধী দলনেতা। প্রথমটি কলকাতায়। পরের দু’টি জেলায়। শুভেন্দু থাকবেন পূর্ব মেদিনীপুরেই। ফলে, রথ-যুদ্ধ এ বার মুখোমুখি।
দিঘার নতুন মন্দির থেকে পুরনো মন্দির পর্যন্ত কিলোমিটারখানেক এলাকা ঘুরবে রথ। বিভিন্ন পবিত্র স্থানে তা দাঁড়াবে। গোটা পথেই ভক্তরা রথের রশিতে টান দিতে পারবেন। মুখ্যমন্ত্রী-সহ ভিভিআইপিদের আগমন ঘিরে নিরাপত্তার মোটা চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে সৈকতশহরকে। হাজার বিধিনিষেধ পেরিয়ে দিঘা অবশ্য তৈরি নিজেকে মেলে ধরতে। বাঙালির কাছে দিঘা মানেই সমুদ্র। জগন্নাথ মন্দির তাতে যোগ হয়ে আকর্ষণ বেড়ে গিয়েছে বহুগুণ। হোটেলে হোটেলে ঝুলছে ‘ঘর নেই’ এর বোর্ড। মহাখুশি শহরের টোটোওয়ালারা। রথের আগে আচমকাই যেন দীপাবলির রোশনাই সৈকতে।
হিন্দু ভোটের যে লাইন শুভেন্দু আমদানি করেছেন, তার জবাব দিতে চায় তৃণমূল। তাই, গেরুয়া শিবিরের সবচেয়ে মুখরা নেতার জেলায় গিয়ে ‘ধার্মিক কর্মসূচি’ মমতার। বিজেপি যে ভাবে হিন্দুদের একজোট করার ডাক দিয়েছে তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে নিজের হিন্দু ভোটকে অক্ষত রাখতে হবে মমতাকে। দিঘায় রথের রশিতে টান, সেই কাজে সুবিধা করে দিতে পারে মমতার।আর যদি তেমনটা না হয়, হাসি ফুটবে শুভেন্দুদের মুখে।
