সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
ভাষা মানে শুধু কথা বলা নয়। ভাষা হল আত্মপরিচয়, চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। ভাষার অধিকার নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই। যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে দেশের সংবিধান। ভাষার আন্দোলন যেন জাতিসত্তা প্রকাশের সংগ্রাম। সামাজিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মাধ্যম হলো ভাষা। সেই আন্দোলন ও সংগ্রাম আজও প্রাসঙ্গিক। মৌলবাদের বিরুদ্ধে ভাষার রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মঙ্গলবার রাজপথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ” বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান, ক্ষিপ্ত তীর-ধনুক….” এই মন্ত্রেই বাংলা ভাষা ও বাঙালির নতুন আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে নয়া ভাষা সংগ্রামের পথে মমতা।

স্বাধীনতার প্রায় ৭৮ বছর পরও কি ভাষার অস্তিত্ব সংকট? অবশ্য দেশের নবজাগরণের পীঠস্থান বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষ কোনও নতুন গল্প-কথা নয়। ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর অনেক উদাহরণ রয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষেও রাজ্যে রাজ্যে ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান হয়েছে একাধিকবার। তবে তা শুধু প্রাদেশিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বেশ কিছুদিন ধরেই এই বাঙালি বিদ্বেষ কিছু নতুন শব্দবন্ধ তৈরি করেছে। এনআরসি,পুশব্যাক, এসআইআর, রোহিঙ্গা, সংখ্যালঘু আর সঙ্গে অনুপ্রবেশকারী।
জাজবাত বাংলায় আরও পড়ুন
এই বাঙালি বিদ্বেষ সরাসরি বাংলা ভাষাভাষীদের বাংলাদেশি বলে উল্লেখ করে ‘নিজভূমে পরবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত যাঁদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তাঁরা অধিকাংশই বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিক যাঁরা জীবন ও জীবিকার সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছিলেন। আবার এদের মধ্যে অধিকাংশই একটি বিশেষ সংখ্যালঘু শ্রেণিরও বটে। যাদেরকে ‘ভোটব্যাঙ্ক’ তৈরি করে রাজনৈতিক ফসল ঘরে তুলতে চেয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন ও বর্তমান শাসকপক্ষ। আর এই ভোটব্যাঙ্কে ভাঙ্গন ধরাতেই নতুন পন্থায় বাংলা বিদ্বেষ দেশের রাজনীতিতে ফের একবার জাতিসত্তার ফুলকি তুলে ধরেছে।
ইউটিউবেও জাজবাত, আপডেট থাকুন আমাদের সঙ্গে
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবিতে এই জাতিসত্তার আন্দোলন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল। সেকথা মাথায় রেখেই রাজনৈতিক ডিভিডেন্ট পেতে ‘নবজাগরণের আঁতুড়ঘর’ কলকাতার কলেজ স্কোয়ার থেকে ভাষার ভিত্তিতে জাতিসত্তার সংগ্রামের ডাক দিতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তবে বাংলা ভাষা মানেই শুধু রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ নয়, বাংলা ভাষার গভীরতা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। বাঙালির আত্মপরিচয় তার ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভাষা কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতীক নয়। ভাষা হল জাতিসত্তার প্রতীক। সেখানে সমস্ত সম্প্রদায় মিলেমিশে একাকার। আর যে স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করে বাঙালি বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে তাঁর সঙ্গে স্বাধীনোত্তর বাংলার আত্মিক যোগ রয়েছে।
সেখানে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা ধর্মের কোনও ভেদাভেদ নেই। তাই বাংলা ভাষা বাঁচানো মানেই বাঙালিত্ব বাঁচানোর সামিল– সেই পটভূমিকাতেই সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিতে চান তৃণমূলনেত্রী। এক্ষেত্রে গঙ্গা ও পদ্মার দুপারেই সমস্ত ধর্ম-বর্ণের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সহানুভূতি আদায় করা যেমন সম্ভব হবে তেমনি রাজনৈতিকভাবেও যথেষ্ট ফললাভ হতে পারে এপারের শাসকদলের। পাশাপাশি দেশের স্বীকৃত ভাষাগুলির মধ্যে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র স্বীকৃতি দিলেও সরকারি স্তরে বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ার নানা ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
আরও পড়ুন
স্কুল থেকে আদালত— সর্বত্র ইংরেজি আধিপত্য বাংলা ভাষার অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। এই বিষয়গুলিকে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালি জাতিসত্তার নতুন আবেগকে উসকে দিতে চাইছেন। ” বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক…” ঠিক এই তত্ত্বেই আসন্ন ২১ জুলাই-এর মেগা সমাবেশ এবং ২৬-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতিসত্তার আবেগের রাজনীতি নির্বাচনী ময়দানে অন্যতম ‘অনুঘটক’ হতে চলেছে সন্দেহ নেই।
