অভিজিৎ বসু
কখনও জমি ফেরতের দাবি, কখনও ভোটার কার্ড নিয়ে আন্দোলন, কোনো সময় আবার কেন্দ্রের বিরূদ্ধে গর্জে ওঠা কেন্দ্রের বরাদ্দ না দেওয়া একশো দিনের কাজে। আর এইবার একদম সেই পুরোনো খাদ্য আন্দোলনের সূচনার পর একদম ভাষা নিয়ে একটা জোরদার আন্দোলন-এর ডাক দেওয়া মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। যে ভাষা আমরি বাংলা ভাষা। যে ভাষা আমার প্রাণের আরাম আর আত্মার শান্তি। যে বাংলা ভাষাকে আমরা হৃদয়ে ভালবাসি লালন পালন করি। যে ভাষা নিয়েই যত টানটান উত্তেজনা বর্তমানে।
মুখ্যমন্ত্রীর ২১-র মঞ্চে বক্তব্যে কেন্দ্রের ফরমান এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে এটা নয়। বেশির ভাগটাই তিনি বাংলা নিয়ে বললেন গলা ফাটিয়ে আওয়াজ তুললেন। বাংলা ভাষার উপর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলনের ডাক দিলেন তিনি একদম সুপরিকল্পিত ভাবেই। যে ডাক দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া বাঙালির ঘুরে দাঁড়াবার সুযোগ করে দিলেন এদিন ২৬ এর ভোটের আগে ২১ এর মঞ্চে।
যে ঘুমিয়ে পড়া কেমন ঝিমিয়ে পড়া একটা জাতিকে নতুন করে কোরামিন দিয়ে দাঁড় করাবার চেষ্টা করলেন তিনি তাঁর উদাত্ত কন্ঠে। শুধুই ভাষার জন্য ঘুরে দাঁড়ানো আর কী। শুধুই বাংলাকে ভালোবেসে রুখে দাঁড়ানো। যে বাংলা আর বাঙালিয়ানা আমাদের সিম্বল এর একমাত্র সম্বল। বিজেপির বিরুদ্ধে তিনি বললেন, দেখবে আর জ্বলবে, লুচির মতো ফুলবে। সেই লুচি আমরা ফুটো করে খেয়ে নেব। এইসব বাণীগুলো কিন্তু বেশিরভাগই হিন্দিতে বললেন তিনি। একটা কবিতা বললেন তিনি হিন্দিতে সরোফরোশ কা তমন্না। আর সেই বহু বার শোনা কবিতার লাইন সারে জাহাসে আচ্ছা হিন্দুস্থান হামারা। যা আগেও শোনা গেছিল অনেক বার যদিও সেটাও হিন্দিতেই বলেছেন তিনি।
একদিকে বাংলা ভাষাকে বাঁচানোর উদাত্ত কণ্ঠের একটা ডাক। যে ডাক তিনি এর আগেও বহুবার ভোটের আগে দিয়েছেন। এই ভোটকে কেন্দ্র করেই তো ভাষাকে বাঁচানোর চেষ্টা। যা এখন না দিলেও পরে বেশ ভালই ডিভিডেন্ড দেবে কিন্তু। যে ডিভিডেন্ড এর আশায় তাঁর এই রাজনৈতিক সমাবেশে দাবার চাল দিয়ে রাজাকে কিস্তি দেওয়া।
জাজবাত বাংলায় আরও পড়ুন
অবশ্য আমবাঙালি এখনো খুব ভালভাবে না জানলেও দুটো গানই যে ভারতীয়তার প্রানের বার্তা তা বহু দেশপ্রেমী মানুষ জানতেন একসময় এবং এখনও জানেন। যদিও বাংলা ও বাঙালিকে হতমান করার এই দু:সময়ে তাকে প্রতিহত করার ডাকে উদ্দীপ্ত হয়ে যেত কিছু উগ্রচণ্ডী আবেগে বা প্ররোচন সৃষ্টি করার জন্য অন্যভাষীদের হেনস্তার রাস্তা লাভ ধরে সেটাও দিদি সম্ভবত ভেবে দেখেছে বলেই ওই দুই গানের উল্লেখ করা বাঙালি যে ভাষা বিদ্বেষী নয় সেটা বলতে চেয়েছেন।
হোক, বক্তৃতার একটা বড় অংশ ছিল বাঙালি খেদানো নিয়ে। প্রত্যাশিতভাবেই। বিস্ফোরক দুটো কেন্দ্রীয় সার্কুলার দেখালেন, একটা নাকি শুধু বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে পাঠানো। সেখানে বাংলাদেশি সন্দেহ হলেই এক মাস আটকে রাখতে বলা হয়েছে। এই সার্কুলারগুলো, দেখিয়েই যখন দিলেন, তখন সেগুলো বার করে দেওয়া হোক। আর বাঙালি তাড়ানো যখন হচ্ছেই নানা রাজ্য থেকে, তার প্রতিষেধক কী জানানো হোক। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যখন, তখন অন্য রাজ্যের কারবারে তো হাত দেওয়া যায়না, সহজেই যেটা করা যায়, সেটা হল নিজের রাজ্যে ভূমিসন্তান সংরক্ষণ। সেটা তো উনি করবেন না।
ফলে গোবলয় থেকে বাঙালি মার খেয়ে ফিরবে, আর বাংলায় সারেজাঁহাসে আচ্ছা গাইবে, এইই হবে আর কী। তবে বাংলা থেকে বাঙালি বিতাড়ন আটকাবেন নিশ্চয়ই। এলাকায় বিজেপি নেতাদের ঘেরাও করতে বললেন। বিজেপিকে দিল্লি থেকে উৎখাত করার ডাক দিলেন। নতুন স্লোগান, জব্দ হবে, স্তব্ধ হবে। এই বাজারে তাই বা দিচ্ছে কে। যা বাংলায় বলাবলি ও লেখালেখির যে দু:সময় চলছে সেটা বিস্তারিত না বললেও বাঙালিজন মাত্রেই সেটা জানেন। অবশ্য বাংলায় কথা বলতে অনেক ক্ষেত্রেই বা বাংলায় কোনও আবেদন পত্র লিখতে অনেকেই লজ্জা পান। যারা এটা করেন তাদের বিদ্যাবুদ্ধি ও পারিবারিক সামাজিক মান নিয়ে সংশয় প্রকাশও করেন কেউ কেউ। এরা গোত্রান্তরের বা গ্রহান্তরের হবেন বোধহয়। তবে সংখ্যায় বাড়ছে সেটা।
আরও পড়ুন
বাংলা নিয়ে কথা বললে, এদের বিবেচনায়, বাঙালি অস্মিতায় ঘি ঢেলে ভারতীয়তা জলাঞ্জলি দেওয়ার আয়োজন চলছে।আমাদের প্রাচীণ ও নবীন সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক ও বাহকরা অবশ্য ভাবতে শিখিয়েছেন এবং ভাবাচ্ছেন যে, যার যার মাতৃভাষার ও সংস্কৃতির বিকাশ আসলে ভারতীয়তার বিকাশ। রাজনৈতিক নেতারা তাদের ভোটের স্বার্থে কে কী বলছেন বা বলবেন সেটা তাদের ক্ষমতার সমীকরণের অংক। তার সংগে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারের অনুকূলে প্রাণ-মনের আনন্দ যাপনের সম্পর্ক দূরায়ত।
যা এইদিক থেকে ভাবুক বাঙালি দিদির কাছে আরও স্বচ্ছভাবে এই দু:সময়ে বাঙলা ভাষার বিকাশে স্কুল পর্যায়ে সর্বত্র সর্ব মিডিয়ামে অন্তত অষ্টমমান পর্যন্ত বাংলা পড়া বাধ্যতামূলক অন্য ভাষাভাষির ক্ষেত্রেও করার ভাবনার কথা বলতে পারতেন কিন্তু সেই প্রসঙ্গ তিনি সুচারু ভাবেই এড়িয়ে গেছেন।
ইউটিউবেও জাজবাত, আপডেট থাকুন আমাদের সঙ্গে
বাঙলা বাঙালি অস্মিতা জাগিয়ে তোলার চেষ্টার অভিযোগ উড়িয়ে দিতে দিদি যদি পরিযায়ী বঙ্গজনকে এই প্রদেশে অন্য প্রদেশের তুলনায় নিশ্চিত কাজ ও মজুরির নিশ্চিত দেওয়ার উপর আর একটু বিশদে তাঁর ভাবনা জানাতেন তবে তা রাজ্যের মঙ্গলের বার্তা হোত এবং আম বঙ্গজনতা দিদির মঙ্গলময়ী এই রূপটি আর একটু স্পষ্ট ভাবে উপলব্ধি করতে পারত। দিদির ভাইরা আরো নিশ্চিন্তে ২৬ এ ঝাঁপাতে পারত জয় বাংলা, জয় মমতা ধ্বনি তুলে।
তবু সব কিছু ভুলে এই বঙ্গে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের মাটিতে বাংলা ভাষা নিয়ে মিছিল করে সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু ভোটের লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছেন। সেটা ভাষার জন্য, বাংলার জন্য না ভিন রাজ্যে মার খাওয়া বাঙালির জন্য কে জানে। আপাতত যা হয় সবটাই যে রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খায় দিদির এই অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ রাজ্যে। জয় বাংলা ভাষার জয়। জয় বাংলার দিদির জয়। জয় মা মাটি আর মানুষের জয়। জয় বাংলা।

