হাবিবুর রহমান, ঢাকাঃ তের বছর বাদে পাকিস্তানের কোন বিদেশমন্ত্রী ঢাকা সফরে আসছেন।ইসহাক দার দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রীও। তিনি আগামী ২৩ আগস্ট দুই দিনের সফরে আসার দিনক্ষণ নির্ধারণ করেছেন।কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের দেড় দশকের শীতল সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে গত এপ্রিলে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের বিদেশসচিব আমনা বালুচ। এরই ধারাবাহিকতায় ইসহাক দার তাঁর সফরে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্তরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।
২০১২ সালের পর পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই প্রথম বাংলাদেশ সফর হতে চলেছে। ইসহাক দার ২৪ আগস্ট বাংলাদেশের বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।অবশ্য এরআগে ইসহাক দারের সফর সামনে রেখে গত ১৬-১৭ এপ্রিল ঢাকা সফর করেন দেশটির বিদেশ সচিব আমনা বালুচ। সে সময় দুই দেশের মধ্যে বিদেশসচিব পর্যায়েও বৈঠক হয়েছিল। চলতি বছর ২৭-২৮ এপ্রিল পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর ঢাকা সফরের কথা ছিল। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের উত্তেজনার কারণে ইসহাক দারের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করা হয়।
প্রসঙ্গতঃ ২০১২ সালে সর্বশেষ পাকিস্তানি বিদেশমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন।উন্নয়নশীল আট মুসলিম দেশের জোট ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে সে সময় ঢাকা সফর করেছিলেন হিনা। ইসহাক দার তাঁর সফরের দ্বিতীয় দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারেন। ঢাকা সফরের সময় ইসহাক দার বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করতে পারেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের নানা পর্যায়ের আলোচনা সক্রিয় করার ওপর জোর দিয়ে আসছে পাকিস্তান। ইসহাক দারের ঢাকা সফরের পর পাকিস্তান দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (জেইসি) বৈঠক ইসলামাবাদে আয়োজন করতে চাইছে।
গত ১৭ এপ্রিল বৈঠকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিবেরা দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে জোর দেয়। অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়, সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সম্পর্ক যেখানে এসেছে, তা এগিয়ে নিতে হলে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত সুরাহা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তিন ঐতিহাসিক ইস্যুতে জোর দেয়। সেগুলো হলো একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন ও অবিভাজিত সম্পদে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রদান। পাকিস্তান এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে।
গত ডিসেম্বরে মিসরের কায়রোতে ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আলোচনা হয়। এ আলোচনায় শাহবাজ শরিফকে মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘বিষয়গুলো বারবার আসছে। আসুন, আমরা সামনে এগিয়ে যেতে এই বিষয়গুলোর ফয়সালা করি।’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিষয়গুলো চিরতরে সুরাহা করে ফেলা ভালো হবে বলে উল্লেখ করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী। ইসহাক দারের আসন্ন বাংলাদেশ সফরে তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের শীর্ষ কিছু ব্যবসায়ীর আসার কথা রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত ১৪ জানুয়ারি জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল গঠনে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। এরপর গত ২৮ এপ্রিল ঢাকার একটি হোটেলে ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম’অনুষ্ঠিত হয়।বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেড়েছে।
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাকের কাঁচামাল আমদানি করে। পাশাপাশি খাদ্যশস্যের সংকট দেখা দিলে তা সংগ্রহের অন্যতম উৎস হয় পাকিস্তান। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট, চা, কাঁচা ও কিছুটা প্রক্রিয়াজাত চামড়া এবং হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আমদানি করে পাকিস্তান।
