সরকারি পরিষেবাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ফলপ্রসূ করে তুলতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করার পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। অর্থ দপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজ্যের প্রশাসনিক কাজকর্মে প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে চলেছে। মূলত, নাগরিক পরিষেবার মানোন্নয়ন, দুর্নীতি রোধ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে গতিশীল ও নির্ভুল করার লক্ষ্য নিয়েই এই সিদ্ধান্ত বলে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই একাধিক প্রযুক্তি সংস্থাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অর্থ দপ্তর সূত্রে খবর, চারটি মূল ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রয়োগ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে উপভোক্তা চিহ্নিতকরণ, জমির মূল্য নির্ধারণ, পুরনো নথিপত্রের ডিজিটাইজেশন এবং প্রশাসনিক ফাইল স্ক্রুটিনির প্রক্রিয়া। এআই এবং মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সহায়তায় গঠিত হতে চলেছে ‘ইউনিফায়েড সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ প্ল্যাটফর্ম’। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করে সামাজিক প্রকল্পগুলির সুবিধা সরাসরি উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। ইতিমধ্যেই ‘দুয়ারে সরকার’ এবং ‘আমাদের পাড়ায় আমাদের সমাধান’ শিবিরে যেসব আবেদন জমা পড়ছে, সেই ডেটাই ভবিষ্যতে এই রেজিস্ট্রির ভিত্তি হয়ে উঠবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছেন, রাজ্যের প্রতিটি নাগরিক যাতে একাধিক পরিষেবা একত্রে পেতে পারেন, তার জন্য বুথ স্তরে এই শিবিরে আবেদন জানানো যাবে।
অর্থ দপ্তর সূত্রে আরও জানানো হয়েছে, জমির ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি ডায়ানমিক এআই মডেল তৈরি হচ্ছে। এতে অঞ্চল, বাজারদর, পরিকাঠামোর মান সহ একাধিক পরিসংখ্যান ও ফিল্ড ডেটা বিশ্লেষণ করে জমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা যেমন বাড়বে, তেমনই রেজিস্ট্রেশন ও কর নির্ধারণে অনিশ্চয়তা ও দুর্নীতির সুযোগ কমবে।
অন্যদিকে বহু পুরনো হাতে লেখা বাংলা নথিপত্র ডিজিটাইজ করে জমির ইতিহাস সংক্রান্ত অনুসন্ধান আরও সহজ করা হবে। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেইসব নথি থেকে নির্ভুল তথ্য নিয়ে তা জমির রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে, যা জমি কেনাবেচার প্রক্রিয়ায় একটি বড় পরিবর্তন আনবে।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আলাদা একটি এআই নির্ভর ফাইল স্ক্রুটিনি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে অর্থ দপ্তরের জন্য। এতে ফাইল যাচাই ও বিশ্লেষণের সময় যেমন কমবে, তেমনই সিদ্ধান্ত নিতেও দেরি হবে না। পাশাপাশি তথ্য সুরক্ষার দিকে নজর রেখে তৈরি হচ্ছে ভার্চুয়াল অ্যাগ্রিগেশন প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মে একাধিক দপ্তরের তথ্যসমূহ একত্রিত হলেও প্রত্যেক দপ্তরের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। এর ফলে বিভিন্ন প্রকল্পে ডেটা যাচাইয়ের কাজ আরও মসৃণ হবে এবং ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আগামী ১১ অগস্ট একটি প্রি-বিড বৈঠকের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তারা প্রযুক্তি, কাঠামো ও প্রয়োগের রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন। চলতি বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তিনির্ভর মডেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে রাজ্য। প্রশাসনিক কাঠামোয় প্রযুক্তির এই সংযোজন ভবিষ্যতে রাজ্য প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও নাগরিক বান্ধব করে তুলবে বলে মনে করছে নবান্ন।
