শ্রাবণী পূর্ণিমা। পবিত্র রাখিবন্ধন। ভারতীয় তথা বাঙালি জাতির বিভিন্ন ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এই দিনটির সঙ্গে। বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে এই দিনটির তাৎপর্য শুধু সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন নয়, বাংলা কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এই দিনটির তাৎপর্য অসামান্য। আর বাঙালি ও বাংলা ভাষার ঐতিহ্য রক্ষা ও একাত্মবোধের যিনি পুরোধা শক্তি সেই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুক্ষণ। তাই আপামর বাঙালির কাছে এই শ্রাবণী পূর্ণিমার চাঁদের স্নিগ্ধতায় যেন জড়িয়ে আছে কান্নার রোল। এই শ্রাবণী পূর্ণিমার চাঁদ যে ‘ রবিহারা ‘।
৬ই আগস্ট, ১৯৪১, শ্রাবণী পূর্ণিমার রাত। চারিদিক চাঁদের আলোয় থই থই। কিন্তু এই কোমল জোছনায় কার যেন কান্না লেগে আছে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির উঠোনে নিঝুম হয়ে আছে ডাক্তারের গাড়ি। রাত বারোটার পরেই কবি অনন্তের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। মর্ত্যলোকের লীলা সাঙ্গ হয়েছে তাঁর। অস্তমিত রবির পুবমুখী শিয়রের ওপাশের আকাশে শান্ত, স্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ।জোছনার চন্দনে কবির ধীরে ধীরে অনন্তলোকের দিকে যাত্রা শুরু। ভরা শ্রাবণ সেদিন বৃষ্টি লুকিয়েছিল। কারণ, মানুষের চোখের জলেই তো মাটি ভিজবে এবার। সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসছে, “কে যায় অমৃতধাম যাত্রী…”।।
মৃত্যুর দিন সাতেক আগেও কবি সৃষ্টিশীল ছিলেন। জোড়াসাঁকোয় রোগশয্যায় শুয়ে রানি চন্দকে লিখে নিতে বলেছিলেন। কবি বলে গেছেন, ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন কবিতাটি বলতে বলতে। দিনটা ছিল কবির শেষ বিদায়ের দিন কয়েক আগে ১৪ শ্রাবণ। রানি চন্দ সেদিন লিখেও নেন রবীন্দ্রনাথের শেষ লেখা কবিতাটি- ‘তোমার সৃষ্টির পথ/ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে,/হে ছলনাময়ী।’ ১৬ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের হিক্কা শুরু হয়। কবি কাতর স্বরে তখন উপস্থিত সবাইকে বলেন, ‘একটা কিছু করো, দেখতে পাচ্ছো না কী রকম কষ্ট পাচ্ছি।’ পরের দিন হিক্কা থামানোর জন্য ময়ূরের পালক পুড়িয়ে খাওয়ানো হলেও তাতে কষ্ট কিছুমাত্র লাঘব হল না। ১৮ শ্রাবণ কিডনিও নিঃসাড় হয়ে পড়ল। ২১ শ্রাবণ রাখি পূর্ণিমার দিন কবিকে পুবদিকে মাথা করে শোয়ানো হল। পরদিন ২২ শ্রাবণ, ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের কানের কাছে ব্রাহ্ম মন্ত্র জপ করা হল- ‘শান্তম, শিবম, অদ্বৈতম..’, ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়..।’ রবীন্দ্রনাথ তখন মৃত্যু পথযাত্রী ।জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ঘড়িতে তখন বেলা ১২টা বেজে ১০ মিনিট। আরও একবার ” হীন ” হল বাঙালি।
মহাপ্রস্থানের পথে ধ্বনিত হল নজরুল কন্ঠ–‘রবিহারা’।
কৃষ্ণা- তিথির অঞ্চলে মুখ লুকায়েছে আজ চাঁদে।
শ্রাবন মেঘের আড়াল টানিয়া গগনে কাঁদিছে রবি,
ঘরে ঘরে কাঁদে নর-নারী, “ফিরে এস আমাদের কবি।”
এত আত্নীয় ছিলে তুমি বুঝি আগে বুঝে নাই কেহ;
পথে পথে আজ লুটাইছে কোটি অশ্রু-সিক্ত দেহ।
আশ্বাস দাও, হে পরম প্রিয় কবি, আমাদের প্রানে,
ফিরিয়া আসিবে নব রুপ লয়ে আবার মোদের টানে।
শুনেছি, সুর্য নিভে গেলে হয় সৌরলোকের লয়;
বাংলার রবি নিভে গেল আজ, আর কাহারও নয়।
বাঙ্গালি ছাড়া কি হারালো বাঙ্গালি কেহ বুঝিবেনা আর,
বাংলা ছাড়া এ পৃথিবীতে এত উঠিবে না হাহাকার।
ভু-ভারত জুড়ে হিংসা করেছে এই বাংলার তরে-
আকাশের রবি কেমনে আসিল বাংলার কুঁড়ে ঘরে।।
ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ যেদিন অমৃতলোকে যাত্রা করেছিলেন সেদিনও ছিল পূর্ণিমার রাত, স্নিগ্ধ জোৎস্না। তাই তো সেদিন শোকাহত রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে”। হয়ত প্রিয় শমীর ডাকে অথবা শমীর কাছে যেতেই প্রিয় শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা রাতকেই বেছে নিয়েছিলেন বাঙালির প্রাণের কবি।
