অয়ন্তিকা দত্ত মজুমদার
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। দেশ স্বাধীন হওয়ার উদযাপনে মেতেছে আর ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে আগুন ধরিয়ে দিল একটা ছবি, ‘শোলে’। সেই ছবির সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষের প্রেক্ষাপটে ফিরে দেখা এই কিংবদন্তি সৃষ্টির গল্প। এক গল্প, যা শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালের বম্বে (অধুনা মুম্বই) শহরে, সিগারেটের ধোঁয়ায় ঢাকা এক ঘরে, যেখানে এক তরুণ পরিচালকের স্বপ্ন আর এক নবাগতের জেদ মিলে তৈরি হচ্ছিল হিন্দি সিনেমার সর্বকালের সেরা খলনায়ক, গব্বর সিং।
শহরতলির ‘সাটে হাউস’-এ অধীর হয়ে বসে আছেন পরিচালক রমেশ সিপ্পি। “কতজন আছে?”, সেলিম খানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন তিনি। “একজন, রমেশ।” বিয়ারের কাপে চুমুক দিতে দিতে গম্ভীর গলায় জবাব দিলেন সেলিম। পাশেই জাভেদ আখতার সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে কলম ঘুরিয়ে ভাবছেন গল্পের গিঁট মেলানোর কৌশল।
তখন সেলিম-জাভেদের কলমে গড়ে উঠছিল ‘শোলে’—অ্যাকশন, নাটক, আবেগ—সব মিশিয়ে এক মহাকাব্য। কিন্তু বড় বাধা—গব্বর সিং-এর জন্য সঠিক অভিনেতা কে?
পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন ড্যানি ডেঞ্জংপা। কিন্তু ‘ধর্মাত্মা’-র শুট করতে আফগানিস্তানে চলে যাওয়ায় রমেশ সিপ্পির পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। অমিতাভ বচ্চন, সঞ্জীব কুমারের নামও ঘোরে, কিন্তু অনুমতি মেলে না। প্রেমনাথের কথাও ভাবা হয়েছিল, কিন্তু খামখেয়ালি স্বভাব ভেবে সিপ্পি পিছিয়ে যান। ঠিক তখনই ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। আমজাদ খান। পাঠান বংশের এক তরুণের খোঁজ পাওয়া তখন সময়ের অপেক্ষা। বাবা জয়ন্ত ছিলেন ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্দার এক দাপুটে চরিত্র, গম্ভীর কণ্ঠ আর ব্যক্তিত্বে দর্শক কাঁপিয়ে দেওয়া অভিনেতা। ছেলে আমজাদও সিনেমায় নাম লেখালেও ভাগ্য সঙ্গ দেয়নি। এই সময় বাবার বন্ধু সেলিম খানের সঙ্গে দেখা। তিনিই প্রতিশ্রুতি দিলেন, “তোমাকে সিপ্পির সঙ্গে পরিচয় করাব। যদি এই রোল পাও, জীবন বদলে যাবে।”
কিছুদিন পর সেলিম, রমেশ সিপ্পিকে বললেন, “গব্বরের জন্য একজন আছে আমার মনে। নতুন, কিন্তু প্রতিভাবান।”
এরপর তাঁদের প্রথম দেখা। সাটে হাউসের দরজা খুলল। প্রথমে চোখ গেল পায়ে—মজবুত, খানিক ভারী। তারপর ওপরে মুখ—দৃঢ়, চোয়ালে চাপা গাম্ভীর্য। রমেশ সিপ্পি মনে মনে ফিসফিস করলেন, “এই তো আমার গব্বর।”
তবে সবাই তেমন উচ্ছ্বসিত নন। অনেকে বললেন, “গলাটা খুব হালকা, ডাকাতের মতো নয়।” কেউ প্রস্তাব দিলেন, ডাবিং করানো যাক। কিন্তু সিপ্পি আঁকড়ে ধরলেন নিজের বিশ্বাস—শুধু চেহারা নয়, চোখের দুষ্টুমি আর হিংস্রতার ঝলকই তাঁকে গব্বর বানাবে। অডিশনে সেই বিশ্বাস প্রমাণিত হয়। আমজাদ গর্জে উঠলেন, “ইয়ে হাত হামকো দে দে, ঠাকুর!” সংলাপ যেন কাগজ থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এল। উপস্থিত সবাই বুঝে গেলেন, এ শুধু চরিত্র নয়, জন্ম নিল এক কিংবদন্তি।
এরপর শুটিং শুরু হল বেঙ্গালুরুর কাছে রামনগরমে। পাথুরে গাঁ, ধুলো আর তপ্ত রোদে মোড়া এক জনপদ। এক সকালে বম্বে থেকে রওনা দিলেন আমজাদ। আশা আর আত্মবিশ্বাসের ডানায় ভর করে। কিন্তু উড়ান শুরুর কয়েক মিনিটেই বিমান ফিরে এল, হাইড্রলিক সিস্টেমে গোলমাল। এক ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্ত্রী শেহলা খান জানান, মেরামতির পর তিনি একই বিমানে চড়ে বসেন। দেরি করতে চাননি। বেঙ্গালুরু পৌঁছে জ্বরে কাবু। ভাবছিলেন, মাঝআকাশে যদি ফের বিপদ হত! বাড়িতে তখন মাত্র দুই মাসের সন্তান। কিন্তু ঝুঁকি নিলেন, কারণ সুযোগ হারালে ড্যানিকে আবার ডাকা হতে পারে ভেবে। আমজাদ জানতেন, “যো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া।”
প্রথম ক’দিনের শুটিং যেন ভরাডুবি। ডায়লগ ভুল, ক্যামেরার সামনে হোঁচট। কিন্তু সিপ্পির ধৈর্য আর উৎসাহে ধীরে ধীরে বদলে গেলেন তিনি। পাহাড়ি পাথরের ফাঁকে আমজাদ হয়ে উঠলেন গব্বর। রিভলভার ঘোরানো, পান চিবোনো, মাছি-মশা আর মানুষ চেপে ধরা, ঠোঁটের কোনায় শয়তানি হাসি—সবই কাঁচা, অনিয়ন্ত্রিত শক্তিতে ভরপুর।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শোলে মুক্তি পেলে, গব্বর সিং ঝড়ের মতো পর্দা দখল করলেন। “কিতনে আদমি থে?”, “হোলি কব হ্যায়?”—চায়ের ঠেক থেকে পানের দোকান, সর্বত্র তাঁরই সংলাপ যেন তখন স্লোগানের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের ভাষায় যাকে বলে ‘ভাইরাল’। গব্বরের হাসি, কণ্ঠের কর্কশ ভাব, আর হুমকি এমন দাপট দেখাল যে ধর্মেন্দ্র, সঞ্জীব, অমিতাভ—সবাই মুহূর্তে তাঁর ছায়ায় ঢাকা পড়লেন।
গব্বর: এক এবং অদ্বিতীয়
বছর কয়েক আগে রামগোপাল ভার্মা ‘শোলে’-র নতুন সংস্করণ বানিয়ে অমিতাভ বচ্চনকে গব্বর করলেন। কিন্তু মূল ছবির তুলনায়, এমনকী কিংবদন্তি বচ্চনও এখানে ফিকে। প্রমাণিত হল, গব্বর সিং একজনই ছিলেন, আছেন, এবং থাকবেন।
গব্বর শুধু আমজাদের অভিনয়ের ফল নয়; ছিল সেলিম-জাভেদের কলমের জাদু, সিপ্পির দৃষ্টি আর আমজাদের ক্ষমতা। প্রচলিত খলনায়ক ধাঁচ ভেঙে ফেলার।
যেমন মোরিয়ার্টি হোমস-এর সমান তীক্ষ্ণ, গব্বরও জয়-বীরুর সমান বুদ্ধি, কৌশল আর দাপট নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যেন তাঁদেরই অন্ধকার প্রতিবিম্ব। সেই কারণেই সংঘাতটা মহাকাব্যের স্তরে পৌঁছেছিল।
গব্বর আসার আগে খলনায়ক মানে ছিল একরকম চরিত্র, একই ধাঁচে তৈরি। কানহাইয়ালালের মহাজন, প্রাণের জমিদার, অজিতের চোরা ব্যবসায়ী, প্রেম চোপড়ার ভীরু বদমাশ। গব্বর আলাদা ছিলেন। ভয় দেখিয়ে শাসন করতেন, তবু একটা আকর্ষণ ছিল তাঁর মধ্যে। তাঁর সংলাপে ছিল বিকৃত নীতি, ভীরুতার শাস্তি প্রাপ্য, প্রতিশোধ ন্যায্য, লোভ খারাপ, নারীদের দূর থেকে উপভোগ করতে হবে। তিনি শুধু খারাপ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমনই একজন, যে সম্পূর্ণ ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে কলুষিত করে। তিনি ভীরু সঙ্গী মেরেছেন, নিরপরাধ শিশুকেও ছাড়েননি। জাভেদ আখতার বলেছিলেন, আমজাদ গব্বরের মধ্যে এনেছিলেন “আনন্দময় নিষ্ঠুরতা”, যা তাঁকে অমর করেছে।
গব্বরের পর ক’জনই বা মনে দাগ কেটেছেন? শাকাল, মোগ্যাম্বো, কাঞ্চা চীনা, বিল্লা জিলানি সবাই গব্বরের ছায়া বহন করেছে, কিন্তু স্বতন্ত্র হয়ে উঠতে পারেনি। পঞ্চাশ বছর আগে জন্ম নেওয়া গব্বর ২০২৫-এও রয়ে গেছেন বলিউডের সেরা খলনায়ক। প্রতিটি সংলাপে, প্রতিটি অট্টহাসিতে, প্রতিটি হৃদয়ে, যা তাঁর নাম শুনে কেঁপে ওঠে।
আজ যদি সাম্ভাকে জিজ্ঞেস করা হয়—গব্বরের কিংবদন্তি আর কত বছর বাঁচবে—উত্তর হবে—“পুরে পঁচাস হাজার!”

