সন্দীপন বিশ্বাস
বাংলার মানুষকে এবং বাংলা ভাষাকে হেয় করার জন্য লাফিয়ে উঠেছে মোদি অ্যান্ড কোম্পানি। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর বাঙালি। সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিবাদে মুখর। দেখে মনে হচ্ছে আবার যেন জেগে উঠেছে সাভারকরের আত্মা, জেগে উঠেছেন শ্যামাপ্রসাদের সহচররা। এই বাংলাকে আবার ভাগ করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে। ভাগ ঠিক বলা যাবে না। আসলে এর মূলে রয়েছে সেই কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের আগ্রাসন। আজ বাংলাকে আর একটা উত্তরপ্রদেশ বা বিহার বানানোর গোপন কৌশল নিয়ে নেমেছেন তালেবররা। সাভারকর, গোলওয়ালকর থেকে সেই পরম্পরা চলে আসছে। সাভারকররা নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে দেখতে পারতেন না। তাঁকে খুব ভয় পেতেন। ওঁরা ভালো করেই জানতেন, নেতাজি থাকলে, কোনও কৌশলই কার্যকর হবে না। সেই সময় থেকেই হিন্দুত্ববাদীরা বাঙালিকে ঈর্ষা করে। নরেন্দ্র মোদিতে এসেও সেই বাঙালি বিদ্বেষের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। এর কারণ, ওরা ভয় পায় বাঙালির অস্মিতাকে, ভয় পায় বাঙালির যুক্তিবোধকে, ভয় পায় বাঙালির জাতীয়তাবাদকে। তাই গোপন খেলায় নেমেছে বাংলাকে বিপর্যস্ত করতে।
অনেক শিশুর মধ্যে একধরনের ইনস্টিক্ট থাকে, সে যদি কোনও খেলনা না পায়, তাহলে সে খেলনাটাকে ভেঙে দেয়। অর্থাৎ আমি না পেলে অন্যকেও পেতে দেব না। এটা যেন ‘বুড়ো’ শিশু বিজেপির মানসিকতা। বাংলায় আমি নির্বাচনে জিততে পারিনি, তাই ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও, বাংলাকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দাও। বাঙালিকে ভাতে মারো, ওকে প্রশাসনিক দিক থেকে মারো, ওর টাকা বন্ধ করে দাও, ইডি-সিবিআই লেলিয়ে দাও। প্রতিদিন বাংলা ভাষাকে অপমান করে পুরো জাতিটাকেই আননার্ভড করে দাও। আর বিজেপির এই নির্লজ্জ খেলায় হাত মিলিয়েছে এ রাজ্যেরই কিছু ধামাধারী। সমস্ত নির্লজ্জতার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা আনন্দে শিঙে ফুঁকছেন। বাঙালির নিশ্চয়ই তাঁদের চিনতে বাকি নেই।
ভারত ভাগের মূল দাবিদার ছিলেন বিড়লা এবং সাভারকর। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের আগেই তাঁরা এমন দাবি তুলেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ তো বেশ দাপিয়ে বলেছিলেন, ভারত ভাগ যদি নাও হয়, বাংলা ভাগ করতেই হবে। বাংলা ভাগের ইতিহাস জানতে গেলে অবশ্যই জয়া চট্টোপাধ্যায়ের বই পড়তে হবে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যে গবেষণাটি করেছিলেন, সেটির নাম, বেঙ্গল ডিভাইডেড। এই একটা বইই সেদিনের হিন্দুত্ববাদী নেতাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ফাঁস করে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বাংলা ভাগের পিছনে রয়েছে হিন্দুত্ববাদী নেতাদের ভয়। একদিকে বেঙ্গল কংগ্রেসের নেতা এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো নেতাদের প্রয়াসের ফসল ছিল সেদিনের বাংলা ভাগ। তাঁরা মনে করতেন বাংলাকে ভাগ করতে না পারলে শাসনক্ষমতার দখল নেবে মুসলমানরা। এদের ভাবনার সঙ্গে একেবারে সাধারণ মানুষরা কিন্তু শরিক হননি। মুসলমান কিংবা হিন্দুরা ছিলেন এই বাঁটোয়ারা কামী নেতাদের স্বার্থচিন্তার শিকার। শ্যামাপ্রসাদ ১৯৪৭ সালের ১১ মে বল্লভভাই প্যাটেলকে একটা চিঠি লেখেন। তাতে শ্যামাপ্রসাদ লিখেছিলেন, পাকিস্তান ভাগ করা থেকে যদি কোনও কারণে জিন্না পিছিয়ে আসেন, তাহলেও বাংলা ভাগের পরিকল্পনা যেন বাতিল না হয়। সেই সময় বাংলা ভাগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র বসু। শরৎচন্দ্র বসু, সুরাবর্দি কিংবা অসমের আবুল হালিম বাংলা ভাগ চাননি। কিন্তু সেই মুহূর্তে বাংলায় কোণঠাসা শ্যামাপ্রসাদের তেমন জনপ্রিয়তাই ছিল না। তাঁর থেকে অনেক বেশি জনপ্রিয়তা ছিল শরৎচন্দ্র বসু এবং সুরাবর্দির। বাবা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। উপাচার্য থাকাকালীন নিজেই নিজেকে ডিলিট দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।
শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেসই ছিলেন। কিন্তু বুঝেছিলেন কংগ্রেসে থাকলে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে খুব বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না। ১৯৩৯ সালে সাভারকর বাংলায় এলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পরই বুঝে যান তাঁর কী করা দরকার। তার আগে ১৯৩৬ সালের ২১ আগস্ট কলকাতায় একটি সভায় দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না একজন ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদী’। সাভারকর তাঁর চিন্তাগুলি শ্যামাপ্রসাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন। সাভারকরের মতো শ্যামাপ্রসাদেরও লক্ষ্য ছিল মুসলিমহীন এক হিন্দু ভারতবর্ষের প্রতিষ্ঠা। আবার ক্ষমতার লক্ষ্যে সেদিন শ্যামাপ্রসাদদের মুসলিম লিগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষমতা দখল করতেও মানসিকভাবে তেমন অসুবিধা হয়নি। বাংলায় হিন্দু মহাসভার বিস্তারে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে কলকাতার মারওয়াড়ি ব্যবসায়ীরা। তাঁদের নেতৃত্ব দেন খৈতান অ্যান্ড কোম্পানির মালিক দেবীপ্রসাদ খৈতান। সেদিন কিন্তু বহু বাঙালিও মহাসভার পাশে দাঁড়িয়ে বাংলায় খাল কেটে কুমির এনেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ময়মনসিংহের জমিদার, শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী, মালদহের বাবু ভৈরবেন্দ্র নারায়ণ রায় প্রমুখ। সকলে মিলে সেদিন হিন্দু মহাসভার তহবিলে প্রচুর টাকা দিয়েছিলেন।
মনে রাখা দরকার, ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট গান্ধীজি যখন ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিলেন, সারা দেশ যখন স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছিলেন, তখন দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখেছিল হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লিগ। কেননা ইংরেজরা চায়নি এই দুই দল তাদের বিরুদ্ধাচরণ করুক। ব্রিটিশরা ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির জন্যই কংগ্রেসকে ভেঙে হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লিগ গড়ায় উৎসাহ দিয়েছিল। এই দুই দলই ছিল সেদিন ইংরেজ শক্তির ডান হাত ও বাঁ হাত।
সাভারকর যখন আন্দামানের সেললার জেল থেকে বারবার মুচলেকা দিয়ে ‘আর করব না প্রভু, ক্ষমা করে দিন’ জাতীয় চিঠি লিখছিলেন, তখনই ইংরেজরা বুঝেছিলেন, সাভারকরকে দিয়েই কংগ্রেসের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ভোঁতা করে তুলতে হবে। সেই সাভারকরেরই মানসপুত্র শ্যামাপ্রসাদ তৎপর হয়েছিলেন বাংলা ভাগে।
আজ যেন সেই সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদের আত্মারা জেগে উঠেছে। সেদিনের মতোই আপন স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাকে টুকরো করতে চাইছে। এর পিছনে রয়েছে ক্ষমতা লোলুপতা। তাই বিজেপি বিভিন্ন জনকে উস্কানি দিয়ে দাবি তুলছে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য আর সফল হবে না।
একদিন বাংলা ভাগ করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মানুষের হাতে রাখি পরিয়ে একতার বন্ধনে সকলকে বাঁধতে চেয়েছিলেন। ধর্মীয় রাখীবন্ধনকে তিনি করে তুলেছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। আজ রাখীবন্ধনের দিনে বাঙালিকে শপথ নিতে হবে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে অটুট রাখার। এর জন্য ঐক্যবোধের এবং একসঙ্গে গর্জে ওঠার প্রয়োজন। আজকের রাখীবন্ধনের পুণ্যলগ্নই হোক সেই শপথের দিন।
তাছাড়া মনে রাখা দরকার আজকের দিনটিতেই ১৯৪২ সালে সূচনা হয়েছিল আগস্ট বিপ্লবের। সেই বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছিল সারা দেশে। বাংলার জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল সেই আগুন। মাতঙ্গিনী হাজরা সহ শত শত মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন। তাঁদের আত্মদানের কথা ভুলে গেলেও চলছে না। বাংলার এই সঙ্কটকালে আমাদের অন্তরাত্মা না জাগলে সমূহ সর্বনাশ!
