জি করের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের ঘটনার বর্ষপূর্তি। ন্যায় বিচারের দাবিতে কলকাতা শহর জুড়ে আন্দোলন, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, রাত দখল কর্মসূচি, নবান্ন অভিযান। কিন্তু যাকে এই ঘটনার মূল দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা দিয়েছে আদালত তার কী খবর? আর কিছুদিনের মধ্যেই সঞ্জয় রায়েরও বন্দিদশার বর্ষপূর্তি হবে। সংশোধনাগারে কতটা সংশোধন হল সঞ্জয়ের? কলকাতার রাজপথে ন্যায় বিচারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন চলছে। তার কোনও আঁচ পড়েছে? বর্ষপূর্তিতে এসে কি এতটুকু অনুতপ্ত সঞ্জয়? সংশোধনাগার সূত্র বলছে,
সঞ্জয়ের মধ্যে বিন্দুমাত্র বদল ঘটেনি।
ফাঁসি না-দিয়ে আদালত সঞ্জয়কে আজীবন কারাবাসে পাঠিয়েছে৷ এর অর্থ নিজেকে সংশোধনের সুযোগ তাঁর কাছে আছে৷ কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার তো দূরঅস্ত, উলটে সংশোধনাগারের মধ্যে সকলের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে সঞ্জয়। তাঁকে যে কাজ দেওয়া হচ্ছে, তা ঠিকমতো করছে না সে৷ ফলে এবার জেলের মধ্যেই শাস্তি দেওয়া হতে পারে আরজিকর ধর্ষণ-খুন কাণ্ডের মূল দোষীকে৷
প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগার সূত্রে খবর, সঞ্জয় রায়কে শুরুতে বাগান পরিচর্যার কাজ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হয়। তারপর স্থায়ীভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়৷ শুরুর দিকে নিয়ম মেনেই কাজ করছিল সঞ্জয়৷ পরের দিকে নিয়ম অমান্য করতে শুরু করে৷ প্রথমে সহ-বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, পরে সংশোধনাগারের কর্মী-আধিকারিকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার শুরু হয়। কারও কথা শুনতে বাধ্য নয় সে।
জেলের মধ্যেই সংশোধনাগার বন্দিদের জন্য বিভিন্ন কাজের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বাগান পরিচর্যা, অ্যালুমিনিয়ামের বাসন তৈরি করা, জামাকাপড় তৈরি করা, কাপড় ও কাগজের ব্যাগ তৈরি, মুড়ি ভাজা৷ এই কাজগুলি মূলত শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকা বন্দিদের দেওয়া হয়। তবে বন্দিদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, তাঁদের জন্য আলাদা কাজের ব্যবস্থা রয়েছে৷ শিক্ষিত বন্দিদের নথিপত্র লেখা, কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রি ইত্যাদি কাজে জেল আধিকারিকদের সাহায্যের জন্য নিযুক্ত করা হয়। এদের দক্ষ শ্রমিক বলা হয়। পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য বন্দিদের প্রথমে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে দেওয়া হয়। তারপর সেই অ্যাকাউন্টেই জমা পড়তে থাকে পারিশ্রমিক৷ বন্দিদের কাজের ভিত্তিতে তিনটি ভাগ করা হয়৷ অদক্ষ, আধা-দক্ষ ও দক্ষ ৷ অদক্ষ শ্রমিকরা দৈনিক ১০৫ টাকা করে মজুরি পান, আধা-দক্ষ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকদের পারিশ্রমিক প্রতিদিন ১৩৫ টাকা।
একটি নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারেন বন্দিরা৷ সেই টাকা দিয়ে সংশোধনাগারের ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনে খেতে পারেন তাঁরা৷ পরিবারকেও সাহায্য করতে পারেন। মন চাইলে তাঁরা অন্য ভাল কাজেও এই অর্থ খরচ করতে পারেন৷
সঞ্জয় অবশ্য অদক্ষ শ্রমিকদের দলে পড়ে৷ সে একসময় পেশাদার বক্সার ছিল৷ পরে কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করে। কিন্তু জেলে তাঁর একটাই পরিচয়, সাজাপ্রাপ্ত বন্দি৷ কিন্তু তাঁর আচার-ব্যবহারে অনুশোচনা বা সংশোধনের কোনও লক্ষণ নেই বলেই জানা গেছে।
সংশোধনাগার সূত্রে খবর, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে এখন সঞ্জয়কে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ৷ কী শাস্তি তাকে দেওয়া হবে, সেই নিয়েই চলছে আলোচনা৷ কী শাস্তি হতে পারে সঞ্জয়ের? শাস্তির একাধিক বিধান রয়েছে৷ তার মধ্যে অন্যতম হল, জেলে যে রোজগার করছে সঞ্জয়, সেই টাকা খরচ করতে না-দেওয়া। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে না-দেওয়া৷ এছাড়া অন্য শাস্তিও হতে পারে৷ তবে সঞ্জয় যেহেতু আর জি কর ধর্ষণ-খুন মামলার মূল দোষী, তাই এই বিষয়ে প্রেসিডেন্সি সংশোধগার কর্তৃপক্ষের কেউ মুখ খুলতে নারাজ৷ এই নিয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল রাজ্য পুলিশের এডিজি (কারা) লক্ষ্মীনারায়ণ মিনার সঙ্গে৷ তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই।’’ এই নিয়ে যোগাযোগ করা হয় সঞ্জয় রাইয়ের আইনজীবী কৌশিক গুপ্তের সঙ্গেও। তিনি বলেন, “এই বিষয় আমি কিছুই বলতে চাই না৷”
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট সকালে কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চারতলার সেমিনার রুম থেকে এক তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হয়৷ ওই ঘটনায় কলকাতা পুলিশ ধর্ষণ ও খুনের মামলা রুজু করে৷ গ্রেফতার করা হয় কলকাতা পুলিশের সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে৷ পরে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই এই মামলার তদন্তভার নেয়৷
শিয়ালদহ আদালতে পেশ করা চার্জশিটে সঞ্জয় রায়কেই মূল অভিযুক্ত হিসেবে দেখায় সিবিআই। পরে ওই আদালত তাকে এই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে আজীবন কারাবাসের সাজা শোনায় ৷ যদিও পরে আদালতে সঞ্জয় নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে এবং তাকে বেকসুর খালাস দেওয়ার আবেদন জানায়।
এই মামলা এখনও বিচারাধীন। মামলায় তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলকে গ্রেফতার করে সিবিআই। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা৷ অভিযোগ, রাজ্য সরকার অনুমতি না-দেওয়ায় এই চার্জশিট পেশ সম্ভব হয়নি। ফলে আদালত দু’জনকেই জামিন দেয়৷ সন্দীপ ঘোষ আরজি করে দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন৷ তাই তিনি জামিন পেলেও সংশোধনাগারে বন্দি৷ তবে অভিজিৎ মণ্ডল জামিন পেয়ে জেলের বাইরে রয়েছেন৷
