রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়
ভুয়ো ভোটার লিস্ট এবং এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের একটানা আক্রমণে এবার পাল্টা আসরে নামল বিজেপি। বুধবার বিজেপির মুখপাত্র প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর সরাসরি নিশানা করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। তাঁর দাবি, এই তিনজনের লোকসভা কেন্দ্রতেও বহু ভুয়ো ভোটারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
ভোট জালিয়াতি নিয়ে বিরোধিতায় রাহুল গান্ধীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সামনের সারিতে রয়েছেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবস মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের কথা বলেন। দিল্লিতে এসে এই কর্মসূচিতে গোটা বিরোধী শিবিরকে হাজির করতে মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন অভিষেক। প্রায় ৩০০ সাংসদ নিয়ে রাজধানীর বুকে এই ব্যাপক জমায়েতের রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনিই।
তাই এদিন অনুরাগ ঠাকুরের আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিলেন ডায়মন্ডহারবার থেকে রেকর্ড ভোটে জেতা তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সাংবাদিক বৈঠকে অনুরাগ দাবি করেন, গত চার বছরে ডায়মন্ড হারবারে অস্বাভাবিক হারে ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। বিধানসভা কেন্দ্র ওয়াড়ি পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি জানান, ফলতায় ১৭%, বজবজে ৩২%, বিষ্ণুপুরে ৫২% আর মহেশতলায় ৮৯% ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের ৩০১টি বুথে ১৫% ভোটার বৃদ্ধি হয়েছে। আর সবকটাতেই জিতেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এরপরই অভিষেকের উদ্দেশে প্রশ্ন অনুরাগের, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, একটু দেখুন কী হচ্ছে? তাহলে কি ভুয়ো ভোটারের সাহায্যেই জিতছেন আপনি?”
বিরোধীদের আন্দোলনকে “চোর মাচায়ে শোর” বলে অভিহিত করে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কেন্দ্রেও ভুয়ো ভোটারের অভিযোগ তুলেছেন অনুরাগ। তাঁর অভিযোগ, রাহুলের রায়বেরেলি কেন্দ্রে ১৯,৫১২ জন ভুয়ো ভোটার, ৭১,৯৭৭ ভুয়ো ঠিকানার ভোটার এবং মোট ৯২,৭৪৭ জনকে একসঙ্গে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
একই রকম ভাবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জেতা ওয়েনাড় কেন্দ্রে ৯৩,৪৯৯ জন ভোটার সন্দেহের তালিকায়। এর মধ্যে ২০,৪৩৮ জন ভুয়ো ভোটার, ১৭৪৫০ জন ভুল ঠিকানার ভোটার এবং ৫১,৩৬৫ জনকে গণহারে তালিকায় যোগ করা হয়েছে।
অনুরাগের অভিষেককে নিশানা করার মূল উদ্দেশ্য, এসআইআর নিয়ে অভিষেকের লাগাতার নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে আক্রমণ। বুধবার বিস্ফোরক অভিষেক। চলতি লোকসভা ভেঙে দিয়ে নতুন করে সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন তিনি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে লক্ষ্য করে তাঁর অভিযোগ, “আপনারা রাজ্য বেছে নিয়ে এসআইআর করতে পারেন না। গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের ভোটার তালিকা সঠিক, আর বিহার বা বাংলায় ভুল? বিজেপি জানে বিহারে অবাধে নির্বাচন হলে তারা হেরে যাবে। আপনারা ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন করতে চাইলে করুন, কিন্তু তার আগে লোকসভা ভেঙে দিন। তারপর গোটা দেশজুড়ে এসআইআর প্রক্রিয়া চালু করুন।”
বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে তিনি বলেন, “বর্তমান ভোটার লিস্টের উপর ভিত্তি করেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী সকলেই জিতেছেন এই ভোটার লিস্ট অনুযায়ী ভোটের মাধ্যমে। প্রয়োজনে আমি নিজে পদত্যাগ করব। তৃণমূল সহ সমস্ত বিরোধী সাংসদরাও পদত্যাগ করবেন। লোকসভা ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন ঘোষণা করুন।”
রাহুল গান্ধীর ‘অ্যাটম বোমা’ ফাটানোর পাশাপাশি অভিষেকের এদিনের লোকসভা ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচনের চ্যালেঞ্জও কম ‘বিস্ফোরক’ নয়। এসআইআর প্রক্রিয়া চালু থাকলে বিহারে দরকারে নির্বাচন বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন বিরোধী দলনেতা তেজস্বী যাদব। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ শুরু হতেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন বনাম রাজ্য সরকারের দ্বৈরথ শুরু হয়ে গেছে। কমিশনের নির্দেশ কার্যকর না করার অভিযোগে দিল্লিতে কমিশনের দফতরে তলব করা হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে।
এই অবস্থায় রাহুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিষেকের নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ এর মোকাবিলায়, পাল্টা তাদের বিরুদ্ধে ভুয়ো ভোটারের ওপর ভর করে জয়ী হওয়ার অভিযোগ তুলছে বিজেপিও।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই এসআইআর বিরোধিতা নিয়ে বিক্ষোভ সংসদের অধিবেশন কক্ষ বা সংসদ প্রাঙ্গণের সীমানা টপকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে বিরোধী শিবির। তাই অনুরাগ ঠাকুরের আক্রমণের লক্ষ্যের একেবারে প্রথমে যে অভিষেক থাকবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
