৮০-৯০-এর দশকের দার্জিলিংকে মনে আছে? তখন দার্জিলিং মানে একটাই নাম সুভাষ ঘিসিং। দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশক দার্জিলিং-এ একচ্ছত্র রাজ ছিল সুভাষ ঘিসিংয়ের। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু কার্যত সুভাষ ঘিসিংকে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। ১৯৮৮ সালে ঘিসিং তৈরি করেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক দল গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট বা জিএনএলএফ। যাদের মূল লক্ষ্য ছিল গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের জিগির তুলে পাহাড়ি শাসনব্যবস্থাকে নিজেদের করায়ত্ত করা। সেই লক্ষ্যে সফল হয়ে জিএনএলএফ সুপ্রিমো ঘিসিং ১৯৮৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল বা ডিজিএইচসি-র চেয়ারম্যান ছিলেন। এহেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ সুভাষ ঘিসিংয়ের হাতে তৈরি জিএনএলএফ দলটির অস্তিত্ব মুছে যেতে চলেছে ? নির্বাচন কমিশন সূত্রে এমনই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ৫ বছরে কোনও ধরনের নির্বাচনে অংশ নেয়নি অথচ নির্বাচন কমিশনের খাতায় যাদের নাম নথিভুক্ত রয়েছে সেই ধরনের স্বীকৃত বা অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলির অস্তিত্ব রয়েছে কি? তা জানতে সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কমিশন নির্দেশ দিয়েছিল এই রাজনৈতিক দলগুলির কাছে চিঠি পাঠিয়ে বা কথা বলে তাদের অবস্থান এবং তাদের পরিস্থিতি সম্বন্ধে আপডেট তথ্য নিতে হবে। আদৌ নথিভুক্ত ঠিকানায় রাজনৈতিক দলগুলির অস্তিত্ব রয়েছে কিনা অথবা কমিশনের শর্ত পূরণ করে রাজনৈতিক দলগুলি তাদের কাজ করছে কিনা তা খতিয়ে দেখে হিয়ারিং করে কমিশনকে জানাতে হবে।
এরাজ্যে ৭২ টি অস্বীকৃত অথচ রেজিস্টার্ড এ ধরনের রাজনৈতিক দল রয়েছে যাদের অধিকাংশেরই টেলিফোনে বা ডাকযোগে চিঠিপত্র পাঠিয়েও যথাযথভাবে কোন সাড়া মেলেনি। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সুভাষ ঘিসিং-এর
জিএনএলএফ।
প্রথম দফায় এধরনের আটটি দলকে ডাকা হলেও হাজির ছিল একমাত্র প্রাক্তন ডিজিপি নজরুল ইসলামের দল। বাকি সাতটি দলকে নির্বাচনী কমিশনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৯ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় যে ১২টি দলকে ইতিমধ্যেই শোকজ করেছে রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর তার মধ্যে রয়েছে সুভাষ ঘিসিং-এর জিএনএলএফ। কমিশনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে অথবা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েও এই রাজনৈতিক দলটির বর্তমান পরিচালক যারা তাদের সম্বন্ধে বিশদ তথ্য সহ রাজনৈতিক দল হিসেবে কমিশনের শর্তগুলির কতটা মান্যতা রয়েছে তা তথ্য প্রমাণ দিয়ে জানানোর কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি
জিএনএলএফ-এর তরফে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বাস্তবে কি জিএনএলএফ অস্তিত্বহীন? ২০১৫ সালে সুভাষ ঘিসিংয়ের মৃত্যুর পরেই ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে জিএনএলএফ। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে সেভাবে সুভাষ ঘিসিং-এর দলকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি। ২০২২ এর জিটিএ নির্বাচনে অংশ নেয়নি জিএনএলএফ। প্রথমে বিমল গুরুংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা বা জিজেএম এবং পরবর্তীতে অনিত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা বা বিজিপিএম-এর দাপটে পাহাড়ে যথেষ্ট ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিল জিএনএলএফ। ধীরে ধীরে সুভাষ ঘিসিং শুধু একটি নামেই পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় সুভাষ ঘিসিংয়ের তৈরি গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট বা জিএনএলএফ-এর রাজনৈতিক দল হিসেবে অস্তিত্ব সংকট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচন কমিশনেও। কারণ নির্বাচন কমিশনের খাতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে নথিভুক্ত থাকলে সেই রাজনৈতিক দলকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। যদি কমিশনের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে ওই রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব আছে কিনা সেই প্রশ্নটাই অনিবার্য হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যেই জিএনএলএফ দলের কর্তৃপক্ষকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরে হিয়ারিং-এর জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছে। দার্জিলিংয়ের জেলা শাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এর কাছেও জিএনএলএফ নিয়ে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। আগামী সোমবার রাজ্যের সিইও দপ্তরে রিপোর্ট পাঠানোর কথা দার্জিলিংয়ের জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে এবং আগামী ২৯ আগস্ট জিএনএলএফ দলের পদাধিকারীদের হিয়ারিং-এর ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে রিপোর্ট পাঠাবে রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এর দপ্তর। ফলে পাহাড়ের রাজনৈতিক দল হিসেবে একদা দোর্দন্ডপ্রতাপ সুভাষ ঘিসিং-এর জিএনএলএফ-এর অস্তিত্ব এখন সুতোয় ঝুলছে বলা যায়।
